নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: খরিফ মরশুমে ধান চাষকে কেন্দ্র করে রাজ্যের কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। মাঠে মাঠে ধান কাটার প্রস্তুতি, কোথাও আবার শুরু হয়েছে নতুন ধান ঘরে তোলার কাজ। এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে ধান কেনার উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য সরকার। সরকারি সহায়ক মূল্যে ধান কেনা, কৃষকদের আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং ফসলের বাজারমূল্য নিশ্চিত করার মতো একাধিক বিষয়কে সামনে রেখে এবারের খরিফ মরশুমে কৃষি অর্থনীতিতে নতুন গতি আনার চেষ্টা চলছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ খরিফ মরশুমে পশ্চিমবঙ্গে ২৪.৬৬ লক্ষ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কুইন্টাল প্রতি অতিরিক্ত ২০০ টাকা দেওয়ার ঘোষণাও সামনে এসেছে। ফলে ধান বিক্রির সময় কৃষকরা কতটা আর্থিক সুবিধা পাবেন, সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে কীভাবে ধান বিক্রি করবেন এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা MSP-এর মাধ্যমে তাঁদের আয় কতটা সুরক্ষিত হবে, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ব্যবস্থায় ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল। রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশই ধান চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলি থেকে গাঙ্গেয় সমভূমি—বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা আবহাওয়া, জমির প্রকৃতি এবং জলসেচের সুবিধা অনুযায়ী ধান চাষ করেন।
বিশেষ করে পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, হুগলি, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহু কৃষক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস ধান উৎপাদন। খরিফ মরশুমে বর্ষার জলকে কাজে লাগিয়ে আমন ধানের চাষ করা হয়। কৃষকরা প্রথমে বীজতলা তৈরি করেন, তারপর জমি প্রস্তুত করে ধানের চারা রোপণ করেন। কয়েক মাস ধরে পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, আগাছা নিয়ন্ত্রণ এবং জলসেচের পর অবশেষে আসে ফসল ঘরে তোলার সময়।
কিন্তু ধান উৎপাদন করলেই কৃষকদের লাভ নিশ্চিত হয় না। বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, জমি তৈরি, সেচ এবং পরিবহণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কৃষকদের উল্লেখযোগ্য খরচ করতে হয়। তার উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিবৃষ্টি, বন্যা কিংবা অনাবৃষ্টির মতো পরিস্থিতি ফসলের ক্ষতি করতে পারে। তাই উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম পাওয়াই কৃষকদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়।
ধান বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা Minimum Support Price (MSP)। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার নির্দিষ্ট মানের ধান একটি নির্ধারিত দামে কৃষকদের কাছ থেকে কেনে। এর ফলে বাজারে ধানের দাম কমে গেলেও সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে নির্ধারিত সহায়ক মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকে।
কেন্দ্রীয় সরকারের ২০২৬-২৭ খরিফ মরশুমের ঘোষিত MSP অনুযায়ী, সাধারণ মানের ধানের সহায়ক মূল্য কুইন্টাল প্রতি ২,৪৪১ টাকা এবং গ্রেড-এ ধানের সহায়ক মূল্য কুইন্টাল প্রতি ২,৪৬১ টাকা। গত মরশুমে সাধারণ ধানের MSP ছিল ২,৩৬৯ টাকা। অর্থাৎ এবারে সাধারণ ধানের ক্ষেত্রে কুইন্টাল প্রতি ৭২ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে MSP-র উপরে কুইন্টাল প্রতি অতিরিক্ত ২০০ টাকা দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রি করলে কৃষকদের প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ আরও বাড়বে।
এবারের খরিফ মরশুমে রাজ্যের প্রাথমিক ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ২৪ লক্ষ ৬৬ হাজার টন। খাদ্য দফতরের হিসাব অনুযায়ী, জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রায় ছয় কোটি রেশন গ্রাহকের জন্য চালের চাহিদা বিবেচনা করেই এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই রেশন গ্রাহকদের জন্য বছরে প্রায় ১৫ লক্ষ ৮৪ হাজার টন চালের প্রয়োজন। সেই চাহিদা পূরণ করতে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে ধান সংগ্রহ করে চাল উৎপাদন এবং সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে।
এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু কৃষকদের আর্থিক সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি উদ্যোগে ধান সংগ্রহের মাধ্যমে রাজ্যের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং রেশন ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত চালের জোগান বজায় রাখাও অন্যতম উদ্দেশ্য।
সরকারি উদ্যোগে ধান বিক্রির জন্য রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় কেন্দ্রীয় ধান ক্রয়কেন্দ্র বা Centralised Procurement Centre (CPC) এবং মোবাইল ধান ক্রয়কেন্দ্র বা mCPC-এর ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সমবায় সংস্থা, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং কৃষক উৎপাদক সংস্থার মাধ্যমেও ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়।
কৃষকদের সাধারণত সরকারি পোর্টালে নাম নথিভুক্ত করতে হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় ও তারিখ অনুযায়ী ধান বিক্রির জন্য স্লট বুক করার সুযোগ থাকে। অনলাইন ব্যবস্থার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি ক্রয়কেন্দ্র, বাংলা সহায়তা কেন্দ্র এবং খাদ্য দফতরের অফিস থেকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের e-Paddy পোর্টালে কৃষকদের নিবন্ধন, ধান বিক্রির সময় নির্ধারণ, ক্রয়ের পরিমাণ এবং অর্থপ্রদানের অবস্থা জানার ব্যবস্থা রয়েছে।
সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রি করার আগে কৃষকদের কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। যেমন—
কৃষকের নাম সরকারি পোর্টালে নথিভুক্ত রয়েছে কি না।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য সঠিক ও সক্রিয় কি না।
জমির প্রয়োজনীয় নথি অথবা স্বঘোষণাপত্র রয়েছে কি না।
নির্ধারিত তারিখ ও সময় অনুযায়ী ধান বিক্রির স্লট বুক করা হয়েছে কি না।
ধানের গুণমান ও আর্দ্রতার পরিমাণ সরকারি নির্ধারিত মান অনুযায়ী রয়েছে কি না।
সরকারি ব্যবস্থায় সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার মূল উদ্দেশ্য হল মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং কৃষকদের প্রাপ্য অর্থ তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়া।
ধানের MSP বৃদ্ধির পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০০ টাকা দেওয়ার ঘোষণা কৃষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চাষের খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ডিজেলের দাম, সার, কীটনাশক, বীজ এবং কৃষিশ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে ধান উৎপাদনে কৃষকদের আর্থিক চাপ বাড়ছে।
একজন কৃষক যদি ৫০ কুইন্টাল ধান সরকারি ব্যবস্থায় বিক্রি করেন, তাহলে কুইন্টাল প্রতি অতিরিক্ত ২০০ টাকা হিসেবে তাঁর বাড়তি প্রাপ্তি হবে ১০ হাজার টাকা। আবার ১০০ কুইন্টাল ধান বিক্রি করলে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকা। এই বাড়তি অর্থ কৃষকদের পরবর্তী মরশুমের চাষের খরচ মেটাতে কিছুটা সাহায্য করতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, এই হিসাব অতিরিক্ত ২০০ টাকার ঘোষিত সুবিধার ভিত্তিতে করা হয়েছে। বাস্তবে কত টাকা পাওয়া যাবে, তা ধানের শ্রেণি, সরকারি ক্রয়নীতি এবং কৃষকের যোগ্যতার উপর নির্ভর করবে।
বাংলায় ধান উৎপাদনের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও কৃষকদের সমস্যার শেষ নেই। অনেক সময় অতিবৃষ্টির কারণে জমিতে জল জমে ধানের গাছ নষ্ট হয়ে যায়। আবার কোথাও অনাবৃষ্টি ও সেচের অভাবে ফলন কমে যায়। বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির প্রভাব অনেক বেশি।
এ ছাড়াও ধান কাটার সময় শ্রমিকের অভাব, কৃষিযন্ত্রের ভাড়া, পরিবহণের খরচ এবং ফসল সংরক্ষণের সমস্যাও কৃষকদের চিন্তার কারণ। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে দ্রুত ধান বিক্রি করে দেন। সেই সুযোগে বাজারের কিছু মধ্যস্বত্বভোগী কম দামে ধান কেনার চেষ্টা করেন।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি ক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো, ধান কেনার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সময়মতো কৃষকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সরকারি উদ্যোগে ধান কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। প্রকৃত কৃষক যাতে সরকারি সুবিধা পান, অন্যদিকে ভুয়ো নাম বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থার অপব্যবহার যাতে না হয়, সে বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
অনলাইন নিবন্ধন, কৃষকের পরিচয় যাচাই, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যাচাই এবং ধান বিক্রির নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণের মতো ব্যবস্থা এই প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে পারে। রাজ্যের খাদ্য দফতরের অনলাইন পোর্টালে এই সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিষেবা ইতিমধ্যেই রয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আরও সহজ করা এবং ক্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত কর্মী ও পরিকাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকরা যাতে নিজেদের উৎপাদিত ধান বিক্রি করতে দূরের কেন্দ্রে যেতে বাধ্য না হন, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
ধান কেনার এই উদ্যোগের সঙ্গে রাজ্যের খাদ্য সুরক্ষার বিষয়টিও সরাসরি জড়িত। সরকারি উদ্যোগে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করার পর তা চালকলে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। উৎপাদিত চালের একটি বড় অংশ রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ফলে একদিকে কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পান, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্যশস্যের জোগানও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কৃষি উৎপাদন, সরকারি সংগ্রহ এবং গণবণ্টন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ খরিফ মরশুমে পশ্চিমবঙ্গের ধান কেনার উদ্যোগ কৃষি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। প্রাথমিকভাবে ২৪.৬৬ লক্ষ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা, MSP-র পাশাপাশি কুইন্টাল প্রতি অতিরিক্ত ২০০ টাকা দেওয়ার ঘোষণা এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় করার পরিকল্পনা কৃষকদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
তবে শুধু ঘোষণা করলেই হবে না। বাস্তবে কতজন কৃষক সরকারি ব্যবস্থায় ধান বিক্রি করতে পারছেন, কত পরিমাণ ধান কেনা হচ্ছে, কৃষকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কত দ্রুত টাকা পৌঁছচ্ছে এবং ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা কতটা সুবিধা পাচ্ছেন, সেটাই হবে এবারের মরশুমের সাফল্যের আসল মাপকাঠি।
কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের দাম নির্ধারণ করতে হবে এবং সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। সেই দাবিগুলি কতটা পূরণ হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে বাংলার কৃষক সমাজ।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি মন্ত্রকের MSP ঘোষণা, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দফতর এবং সরকারি ধান সংগ্রহ সংক্রান্ত তথ্য।
সরকারি ধান বিক্রির পোর্টাল:
সম্পাদনাগত নোট: ২৪.৬৬ লক্ষ টন হল ২০২৬-২৭ মরশুমের প্রাথমিক রাজ্যস্তরের লক্ষ্যমাত্রা। এটিকে চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। সাধারণ ধানের MSP ২,৪৪১ টাকা এবং গ্রেড-এ ধানের MSP ২,৪৬১ টাকা; অতিরিক্ত ২০০ টাকার সুবিধা সরকারি ঘোষণার শর্তসাপেক্ষ।