ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপির সাংগঠনিক অন্দরে এবার প্রকাশ্যে এল অসন্তোষ। দলের রাজ্য কমিটির সদস্য কালীপদ নস্করকে ঘিরে পদ ও সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টনের প্রশ্নে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন ক্যানিং পূর্বের তাড়দহ অঞ্চলের পূর্ব উষপাড়া ১২ নম্বর বুথের বুথ সভাপতি রমেশ মণ্ডল। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দলের হয়ে লড়াই করা এবং কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংগঠনের পাশে থাকা একজন নেতাকে যথাযথ সম্মান ও দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা বিজেপির নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বিশেষ করে জেলা সভাপতি উৎপল নস্করের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন রমেশ মণ্ডল।
রমেশ মণ্ডলের বক্তব্যে উঠে এসেছে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, সেই নির্বাচনে ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন কালীপদ নস্কর। তৃণমূলের শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। রমেশ মণ্ডলের দাবি, সেই সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩৫ হাজার ভোট পেয়েছিলেন কালীপদ নস্কর। তাঁর কথায়, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং নানা বাধা উপেক্ষা করেও কালীপদ নস্কর দলের হয়ে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন।
এরপর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরেও নিজের বক্তব্যে তুলনা টেনেছেন রমেশ মণ্ডল। তাঁর দাবি, রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায় আসার মতো অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরেও ক্যানিং পূর্বে দলের ভোটের ফল আশানুরূপ হয়নি। তাঁর উল্লেখ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে কালীপদ নস্করের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ হাজার। ২০২১ সালের তুলনায় ভোটের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই ফলাফলের দায়ভার কে নেবেন? যদিও নির্বাচনের ফলাফলের কারণ নিয়ে তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবেই উঠে এসেছে।
কিন্তু রমেশ মণ্ডলের ক্ষোভের মূল কারণ শুধু নির্বাচনী ফলাফল নয়। তাঁর অভিযোগ, দলের রাজ্য কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও কালীপদ নস্করকে ক্যানিং পূর্ব বিধানসভার মাত্র একটি মণ্ডলের ইনচার্জের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ ২০২১ সালের নির্বাচনের সময় তিনি চারটি মণ্ডলের সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলেছিলেন বলে দাবি রমেশ মণ্ডলের। ফলে একজন অভিজ্ঞ ও দীর্ঘদিনের সংগঠককে কেন তুলনামূলকভাবে সীমিত দায়িত্ব দেওয়া হল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এই সিদ্ধান্তের জন্য সরাসরি জেলা সভাপতি উৎপল নস্করকে নিশানা করেছেন রমেশ মণ্ডল। তাঁর প্রশ্ন, দলের একজন রাজ্য কমিটির সদস্যকে এভাবে সীমিত সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া কি তাঁকে অপমান করার শামিল নয়? দলের ভিতরে লবিবাজি এবং কিছু নেতার প্রভাবেই কি এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে? যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে জেলা নেতৃত্বের বক্তব্য জানা যায়নি।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে রমেশ মণ্ডল জানিয়েছেন, তিনি কোনও সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক কর্মী নন। তাঁর দাবি, গত তিনটি নির্বাচনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছেন। বুথে দলের এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিজের বুথে বিজেপির জয় নিশ্চিত করতে ভূমিকা নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর যাঁরা দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক পথচলার তুলনা করা যায় না। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লড়াই এবং সাংগঠনিক কাজের অভিজ্ঞতাই তাঁর পরিচয়।
রমেশ মণ্ডল আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কালীপদ নস্করের অনুগামী এবং ভবিষ্যতেও তাঁর পাশেই থাকবেন। তাঁর কথায়, কালীপদ নস্করের সঙ্গে ছিলেন, আছেন এবং আগামী দিনেও থাকবেন। একই সঙ্গে তাড়দহ অঞ্চল থেকে শুরু করে গোটা ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা এলাকার মধ্যে যে লবিবাজির রাজনীতি চলছে বলে তিনি অভিযোগ করছেন, তার বিরুদ্ধেও সরব হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
জেলা নেতৃত্বের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে রমেশ মণ্ডল বলেছেন, রাজনৈতিক পদ ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যাঁদের হাতে সাংগঠনিক ক্ষমতা রয়েছে, আগামী দিনে তাঁদের পরিস্থিতিও বদলে যেতে পারে। তাই দলের পুরনো কর্মী ও নেতাদের সম্মান দেওয়া উচিত। তাঁর মতে, যাঁরা কঠিন সময়ে দলের পাশে থেকেছেন, তাঁদের অবদান অস্বীকার করে সংগঠনকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপির অন্দরে পদ বণ্টন, সাংগঠনিক দায়িত্ব এবং নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে রাজ্য কমিটির সদস্য কালীপদ নস্করের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সরব হয়েছেন বুথ সভাপতি রমেশ মণ্ডল, অন্যদিকে জেলা নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
এখন দেখার, রমেশ মণ্ডলের এই প্রকাশ্য ক্ষোভের পর জেলা বিজেপি নেতৃত্ব কী অবস্থান নেয়। দলের অভ্যন্তরীণ এই অসন্তোষ কি আলোচনার মাধ্যমে মিটবে, নাকি ক্যানিং পূর্বের বিজেপি সংগঠনে লবিবাজি ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ আরও জোরালো হবে? সেই দিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
কঠিন সময়ের সৈনিক বনাম সাংগঠনিক ক্ষমতার লড়াই—ক্যানিং পূর্বে বিজেপির অন্দরের এই বিতর্ক আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।