নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে এবার প্রকাশ্যে চলে এল বিজেপির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। জয়নগর সাংগঠনিক জেলা বিজেপির অন্দরেই একাংশ নেতা-নেত্রীর ক্ষোভকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। দলেরই কয়েকজন নেতা ও নেত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করে ক্যানিং পূর্বের ২০২৬ সালের বিজেপি প্রার্থী অসীম সাপুই এবং জয়নগর সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি উৎপল নস্করের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের এই সাংবাদিক বৈঠককে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, ক্যানিং পূর্বে বিজেপির সাংগঠনিক কার্যকলাপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অসন্তোষ জমা হচ্ছিল। দলের পুরনো কর্মী ও নেতৃত্বের একাংশের অভিযোগ, সংগঠনের স্বচ্ছতা এবং আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এমনকি দলবদল করে আসা ব্যক্তিদের বিজেপিতে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।
সাংবাদিক সম্মেলনে বিজেপির একাংশ নেতা-নেত্রীর দাবি, তৃণমূল থেকে আসা কিছু ব্যক্তিকে অর্থের বিনিময়ে বিজেপিতে যোগদান করানো হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, যাঁরা এতদিন বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁদের দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের সাংগঠনিক নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে? দীর্ঘদিন ধরে দলের হয়ে লড়াই করা পুরনো কর্মীদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের মতে, এই ধরনের ঘটনা দলের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের মনোবলে প্রভাব ফেলতে পারে।
এর পাশাপাশি ২০২৬ সালের ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী অসীম সাপুইয়ের নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করা শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, হলফনামায় দেওয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য সঠিক নয়। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ তদন্তের দাবি উঠতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
অন্যদিকে, জয়নগর সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি উৎপল নস্করকেও সরাসরি নিশানা করেছেন সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত নেতা-নেত্রীরা। তাঁদের অভিযোগ, দলের অভ্যন্তরে যে সমস্ত ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়ে জেলা সভাপতিকে একাধিকবার অবগত করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, বারবার জানানো সত্ত্বেও কোনও কার্যকর পদক্ষেপ করা হয়নি।
এখানেই শেষ নয়, অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, দলীয় যোগদান এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের পিছনে আর্থিক লেনদেন ও ভাগ-বাঁটোয়ারার বিষয়ও জড়িত রয়েছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে কোনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
বিজেপির মতো একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে এভাবে প্রকাশ্যে সাংবাদিক সম্মেলন করে নিজেদের দলের নেতা ও জেলা সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার ঘটনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সাংগঠনিক বৈঠক বা নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরা হয়। কিন্তু সেই অসন্তোষ যখন সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে আসে, তখন তা দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশেষ করে ক্যানিং পূর্বের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্রে এই ধরনের বিরোধ আগামী দিনে বিজেপির সংগঠনের উপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুরনো কর্মীদের ক্ষোভ, নতুন করে দলে যোগদান এবং নেতৃত্বের ভূমিকা—এই তিনটি বিষয় এখন স্থানীয় বিজেপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, দলের অভ্যন্তরে তাঁদের বক্তব্যের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সেই কারণেই তাঁরা প্রকাশ্যে এসে নিজেদের অভিযোগ জানাতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, সংগঠনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং পুরনো কর্মীদের সম্মান দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। দলের ভিতরে কোনও অনিয়ম হয়ে থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
তবে এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত অসীম সাপুই এবং জেলা সভাপতি উৎপল নস্করের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য সামনে এলে গোটা বিষয়টির অন্য দিকও স্পষ্ট হতে পারে।
এখন রাজনৈতিক মহলের নজর জয়নগর সাংগঠনিক জেলা বিজেপির নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। অভিযোগগুলির বিষয়ে দল কি কোনও তদন্ত করবে? নাকি আলোচনার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ মেটানোর চেষ্টা হবে? ক্যানিং পূর্বে বিজেপির এই প্রকাশ্য কোন্দল আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয় কি না, সেটাই এখন দেখার।
দলের ভিতরে পুরনো বনাম নতুন কর্মীর দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রার্থীর হলফনামা নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ক্যানিং পূর্বে বিজেপির অন্দরমহল এখন যথেষ্ট অস্বস্তিতে।