সম্পাদকের কলমে: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল মানেই কি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন? নাকি শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলাবে, অথচ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, হুমকি এবং বিরোধীদের কণ্ঠরোধের পুরনো সংস্কৃতিই নতুন মোড়কে ফিরে আসবে? রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘিরে এই প্রশ্নগুলিই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেসকে রাজনৈতিকভাবে শেষ করার বার্তা, বিরোধী নেতাদের জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারি এবং একের পর এক আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক মন্তব্য ঘিরে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে নানা সংশয়।
রাজ্যের পালাবদলের পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণের সুর শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক সভা থেকে প্রকাশ্য মঞ্চ, বিভিন্ন বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে তৃণমূলকে কোণঠাসা করার বার্তা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কেউ যদি থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কি শুধুই নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি আইনের চোখে অপরাধী যে দলেরই হোক, তাঁর বিরুদ্ধে একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তৃণমূলকে শেষ করার রাজনৈতিক নিধান, নাকি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বার্তা?
একটি গণতান্ত্রিক রাজ্যে কোনও রাজনৈতিক দলকে শেষ করে দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের নয়। সরকারের দায়িত্ব মানুষের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কোনও দলকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করবে কি না, তা ঠিক করবে নির্বাচনের ময়দান। কিন্তু ক্ষমতায় বসে কোনও শাসক যদি বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেন, তাহলে সেই বক্তব্যের গণতান্ত্রিক তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। দোষ প্রমাণিত হলে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী শাস্তি হোক। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে যদি বারবার জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারি প্রাধান্য পায়, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবেই—এটা কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর কৌশল?
মনে রাখতে হবে, বিরোধী দল মানেই অপরাধী নয়। বিরোধী নেতারাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, বিচার হবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার অধিকার কোনও সরকারের নেই।
ডবল ইঞ্জিন সরকারের জমানায় প্রতিহিংসার অভিযোগ কেন?
রাজ্যে যদি সত্যিই ডবল ইঞ্জিন সরকারের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে মানুষের প্রত্যাশা থাকবে প্রশাসনিক দক্ষতা, উন্নয়নের গতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পরেও যদি রাজনৈতিক আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ এবং প্রতিশোধের আশঙ্কা ঘিরে রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত থাকে, তাহলে সেই সরকারকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই হবে।
মানুষ জানতে চায়, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী? কর্মসংস্থান, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন, নাকি প্রতিদিনের রাজনৈতিক সংঘাত?
যে রাজ্যে বেকার যুবক চাকরির অপেক্ষায়, যে রাজ্যে বহু পরিবার কর্মসংস্থানের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেয়, যে রাজ্যে শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারি কি সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্যের পরিচয় হতে পারে?
সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা প্রতিশোধ নয়, সুশাসন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার চেয়ে মানুষের আস্থা অর্জন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সংগঠন ছাড়া ক্ষমতার আত্মবিশ্বাস কতটা বাস্তব?
বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রভাব রয়েছে। পঞ্চায়েত থেকে পুরসভা, ব্লক থেকে বুথ—বিভিন্ন স্তরে তাদের সংগঠন বহু বছর ধরে সক্রিয়। অন্যদিকে, বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি কতটা বিস্তৃত, কতটা সুসংহত এবং কতটা বুথভিত্তিক, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
যদি কোনও রাজনৈতিক দলের নিচুতলার সংগঠন দুর্বল থাকে, যদি বুথস্তরে কর্মীদের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তাহলে শুধু মঞ্চের বক্তব্যে রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা কতটা সম্ভব?
রাজনীতিতে শুধু বড় বড় সভা, মাইক, স্লোগান কিংবা নেতাদের আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি হয় না। সংগঠন গড়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে। বুথে বুথে কর্মীদের উপস্থিতি, স্থানীয় মানুষের সমস্যা সমাধান এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়েই একটি দল নিজের শক্তি প্রমাণ করে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বিজেপি যদি নিজেদের সাংগঠনিক ভিত আরও শক্তিশালী করতে না পারে, তাহলে তৃণমূলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
আগামীকাল ভোট হলে কে থাকবে মসনদে?
ক্ষমতার চেয়ারে বসে রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস দেখানো সহজ। কিন্তু গণতন্ত্রে আসল পরীক্ষা হয় নির্বাচনের দিন। আজ যে দল ক্ষমতায়, আগামী নির্বাচনে সেই দলই ক্ষমতায় থাকবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। ভোটাররাই শেষ কথা বলেন।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, আগামীকাল যদি নির্বাচন হয়, তাহলে কোন দল কতটা জনসমর্থন পাবে? কোন দলের সাংগঠনিক ভিত কতটা শক্তিশালী? কোন নেতা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য? কোন সরকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর কোনও রাজনৈতিক নেতার বুক চাপড়ানো বক্তব্যে পাওয়া যাবে না। উত্তর মিলবে মানুষের ভোটে।
রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। একসময় যারা বিরোধী আসনে বসে শাসকদলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তাঁরাই পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসেছেন। আবার ক্ষমতায় থাকা দলকেও মানুষ সরিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস তার অন্যতম উদাহরণ।
তাই আজকের ক্ষমতাসীনদের মনে রাখা উচিত, বিরোধীদের কণ্ঠস্বরকে দুর্বল করে নয়, মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে হয়।
বিরোধীদের জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারি কি গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ সংকেত?
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ভুল করলে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলবে। সরকারের নীতির সমালোচনা করবে। প্রশাসনের ব্যর্থতা সামনে আনবে। এই অধিকার সংবিধান স্বীকৃত গণতান্ত্রিক পরিসরের অংশ।
কিন্তু যদি রাজনৈতিক বক্তব্যে বারবার বিরোধী নেতাদের জেলে পাঠানোর প্রসঙ্গ উঠে আসে, তাহলে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
অবশ্যই কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। তৃণমূল হোক বা বিজেপি, সিপিএম হোক বা কংগ্রেস—যে দলেরই নেতা দুর্নীতি বা অপরাধে যুক্ত থাকুন, তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু তদন্তের আগে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে শাস্তি ঘোষণা করা হলে আইনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
একজন মুখ্যমন্ত্রী শুধু নিজের দলের নেতা-কর্মীদের প্রতিনিধি নন। তিনি গোটা রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। তাঁর বক্তব্যে তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি সংযম, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক দায়িত্বের প্রতিফলন থাকা জরুরি।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং সরকারের উচিত কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করা যে আইন নিজের পথে চলবে, কোনও রাজনৈতিক নির্দেশে নয়।
অহংকার নয়, মানুষের আস্থাই হোক সরকারের শক্তি
রাজনীতিতে আত্মবিশ্বাস থাকা দরকার। কিন্তু আত্মবিশ্বাস আর অহংকার এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করা যায়, তাঁদের নীতির সমালোচনা করা যায়, নির্বাচনী ময়দানে তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়। কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ যারা ক্ষমতায় রয়েছেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে, একসময় তাঁরাও বিরোধী ছিলেন। একসময় তাঁরাও শাসকদলের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, আন্দোলন করেছেন, রাজনৈতিক অধিকার দাবি করেছেন। সেই অতীত ভুলে গেলে চলবে না।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ঠিক করবে বাংলার মানুষ। বিজেপি কতদিন ক্ষমতায় থাকবে, সেটাও নির্ধারণ করবেন ভোটাররা। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক দলকে শেষ করে দেওয়ার ঘোষণা বা বিরোধীদের জেলে পাঠানোর রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি গণতন্ত্রের সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে পারে না।
শেষ কথা: মানুষ কি উন্নয়ন চায়, নাকি প্রতিশোধের রাজনীতি দেখতে চায়?
পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক সংঘাতের অবসান চান। তাঁরা চান কর্মসংস্থান, শিল্প, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, মহিলাদের নিরাপত্তা, উন্নত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা। তাঁরা চান দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। তাঁরা চান অপরাধীর শাস্তি হোক, কিন্তু সেই বিচার যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকে।
তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললে বিজেপি সরকারকে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। একইভাবে বিজেপির কোনও নেতা বা জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও সেই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তার উত্তরও দিতে হবে রাজনৈতিক কাজের মাধ্যমে, শুধু আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিয়ে নয়।
সবশেষে প্রশ্ন একটাই—বাংলার মানুষ কি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চলেছেন, নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহিংসার রাজনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে?
এই প্রশ্ন শুধু তৃণমূল বা বিজেপির নয়। এই প্রশ্ন গণতন্ত্রের, সংবিধানের এবং বাংলার সাধারণ মানুষের ভবিষ্যতের।
কারণ ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু গণতন্ত্র স্থায়ী হওয়া উচিত। আর গণতন্ত্রে বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার ঘোষণা নয়, বিরোধীদের অস্তিত্বকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই একটি শক্তিশালী সরকারের পরিচয় পাওয়া যায়।