নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ‘বড় চোর যাবে, চিন্তার কারণ নেই!’—বারুইপুরের রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে এই মন্তব্য করে নতুন করে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপির উদ্যোগে আয়োজিত ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ জনসভা থেকে তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএমকে একযোগে নিশানা করেন তিনি। তৃণমূল ও বামেদের মধ্যে গোপন রাজনৈতিক সমঝোতার অভিযোগ তোলার পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লি সফর, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও একাধিক কটাক্ষ করেন বিজেপি নেতা।
সভামঞ্চ থেকে দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দুর দাবি, রাজ্যের মানুষ জানতে চান, বড় চোরের বিরুদ্ধে কবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, ‘আপনাদের মনে প্রশ্ন আছে, বড় চোরটা কবে যাবে। সময়টা একটু দেখে সব ঠিকঠাক করে করতে হয়। বড় চোর যাবে, চিন্তার কোনও কারণ নেই।’ যদিও কাকে উদ্দেশ্য করে তিনি এই মন্তব্য করেছেন, তা নির্দিষ্ট করে জানাননি।
শুক্রবার বারুইপুরে বিজেপির উদ্যোগে আয়োজিত এই জনসভাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট চর্চা শুরু হয়েছে। সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলার বিভিন্ন সাংগঠনিক নেতৃত্ব, মথুরাপুর, যাদবপুর, ডায়মন্ড হারবার ও জয়নগর সাংগঠনিক জেলার নেতাকর্মীরা। বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিতে সভামঞ্চ থেকেই রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী।
তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে গণতন্ত্র, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অধিকার এবং বিরোধীদের উপর কথিত আক্রমণের প্রসঙ্গ। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর বার্তাও দেন তিনি।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএমের রাজনৈতিক সম্পর্ক। তাঁর অভিযোগ, যে তৃণমূল কংগ্রেস একসময় সিপিএমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল, আজ সেই দলই বামেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে।
অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তৃণমূলের রাজনৈতিক যাত্রার সময় বিজেপির তৎকালীন নেতৃত্বের আশীর্বাদ ও সহযোগিতা ছিল। অথচ বর্তমানে তৃণমূলের রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লি সফর এবং বাম নেত্রী বেবি বেগমের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেও কটাক্ষ করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাইরে গিয়ে দিল্লির রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে তৃণমূল। তবে তৃণমূল ও বামেদের মধ্যে কোনও গোপন রাজনৈতিক আঁতাত রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর অভিযোগের পক্ষে সভায় নির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।
সভা থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নাম না করে কটাক্ষ করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁকে উদ্দেশ্য করে ‘এঁচোড়ের পাকা ভাইপো’ মন্তব্য করেন তিনি। ফলতার নির্বাচনী প্রচার এবং ইলেকট্রিক চুল্লি সংক্রান্ত বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে রাজনৈতিক আক্রমণ শানান।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সরব হন বিজেপি নেতা। তাঁর অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূলের রাজনৈতিক আধিপত্যের কারণে বিরোধী দলগুলি স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে সমস্যায় পড়েছে। পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
যদিও এই অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাংসদদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শুভেন্দু। সাত লক্ষ ভোটে জয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানতে চান, এত বিপুল ব্যবধানে জয়ী সাংসদদের সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা দেখা যায়।
পুজোর সময় রাজনৈতিক আমন্ত্রণ, এলাকার মানুষের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের যোগাযোগ এবং সাংসদদের জনসংযোগ নিয়েও ব্যঙ্গ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে বিজেপি আগামী দিনে আরও সরব হতে চায়।
সভায় রামমন্দিরের প্রসঙ্গ তুলে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন শুভেন্দু। পাশাপাশি নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের নির্বাচনী লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, বাংলার রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন এবং শাসকদলের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা। বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার বার্তাও দেন।
সমস্ত বক্তব্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে শুভেন্দু অধিকারীর ‘বড় চোর যাবে’ মন্তব্য। দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এই মন্তব্য করেন তিনি। তবে নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তির নাম না করায় তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য কে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
বারুইপুরের এই জনসভা থেকে শুভেন্দু অধিকারী একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক আধিপত্যের অভিযোগে আক্রমণ করেছেন, অন্যদিকে সিপিএমের সঙ্গে তৃণমূলের কথিত ঘনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
সব মিলিয়ে বারুইপুরের ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ জনসভা দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ বাড়াল। বিশেষ করে ‘বড় চোর যাবে, চিন্তার কারণ নেই’—শুভেন্দুর এই মন্তব্য আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক তরজায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।