নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। ত্বকের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া, বলিরেখা তৈরি হওয়া কিংবা শারীরিক কর্মক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি চুলের মধ্যেও বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অনেকের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল পাতলা হতে শুরু করে, চুলের ঘনত্ব কমে যায়, আগের মতো চকচকে ভাব থাকে না। কারও চুল হয়ে ওঠে শুষ্ক ও রুক্ষ, আবার কারও চুলের স্বাভাবিক গঠন এবং কোঁকড়ানো ভাবেও পরিবর্তন দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুলের এই পরিবর্তনের পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। হরমোনের ওঠানামা, বংশগত বৈশিষ্ট্য, চুলের ফলিকলের স্বাভাবিক বার্ধক্য, পুষ্টির ঘাটতি এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা চুলের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বয়স বাড়লেই যে প্রত্যেকের চুল একইভাবে ঝরে পড়বে বা পাতলা হয়ে যাবে, এমনটা নয়।
মানুষের মাথার ত্বকে অসংখ্য চুলের ফলিকল থাকে। এই ফলিকল থেকেই নতুন চুল তৈরি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের ক্ষেত্রে চুলের ফলিকলের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। ফলে নতুন চুল আগের তুলনায় পাতলা হতে পারে এবং চুলের বৃদ্ধির গতিও কমে যেতে পারে।
এছাড়া চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিচক্রেও পরিবর্তন আসে। সাধারণত চুলের একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে বৃদ্ধি হয়, তারপর বিশ্রাম পর্যায়ে যায় এবং শেষে ঝরে পড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চক্রের পরিবর্তনের কারণে চুলের ঘনত্ব কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে মাথার সামনের অংশ, কপালের দুই পাশ এবং মাথার মাঝখানে চুল পাতলা হওয়ার সমস্যা অনেকের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়।
চুলের স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধির সঙ্গে হরমোনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে বিভিন্ন হরমোনের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তন চুলের ফলিকলের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের প্রভাব এবং বংশগত সংবেদনশীলতার কারণে ধীরে ধীরে চুল পাতলা হতে পারে। একে অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়া বলা হয়।
অন্যদিকে মহিলাদের ক্ষেত্রে মেনোপজের সময় বা তার পরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে চুলের ঘনত্ব কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যেতে পারে। অনেক সময় মাথার মাঝখানের সিঁথি আগের তুলনায় চওড়া হয়ে যায়।
তবে হরমোনের পরিবর্তনই চুল পড়ার একমাত্র কারণ নয়। থাইরয়েডের সমস্যা, পুষ্টির ঘাটতি এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থাও এর পিছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
অনেকেই লক্ষ্য করেন, ছোটবেলায় বা যৌবনে তাঁদের চুল যেমন ছিল, বয়স বাড়ার পর আর তেমন থাকছে না। কারও সোজা চুল কিছুটা ঢেউখেলানো হয়ে যাচ্ছে, আবার কারও কোঁকড়ানো চুলের স্বাভাবিক গঠন বদলে যাচ্ছে।
এর অন্যতম কারণ হল চুলের ফলিকলের আকৃতি এবং কার্যকারিতার পরিবর্তন। চুলের ফলিকলের গঠন চুল সোজা, ঢেউখেলানো নাকি কোঁকড়ানো হবে, তার উপর প্রভাব ফেলে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুলের ফলিকলের পরিবর্তন হলে নতুন চুলের গঠনেও কিছুটা পার্থক্য দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি চুলের প্রাকৃতিক তেল বা সেবাম উৎপাদন কমে গেলে চুল শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
চুলের রং নির্ভর করে মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থের উপর। চুলের ফলিকলের মধ্যে থাকা বিশেষ কোষ মেলানিন তৈরি করে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কোষগুলির কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। ফলে চুলে মেলানিনের পরিমাণ কমে যায় এবং ধীরে ধীরে চুল ধূসর বা সাদা হয়ে যেতে পারে।
এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে বংশগত কারণে তুলনামূলক কম বয়সেই চুল পেকে যেতে পারে।
শুধু বয়স নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপনের একাধিক বিষয় চুলের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
১. পুষ্টির ঘাটতি: শরীরে আয়রন, প্রোটিন, জিঙ্ক এবং কিছু ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে চুল পড়ার সমস্যা বাড়তে পারে।
২. মানসিক চাপ: দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিচক্র ব্যাহত হতে পারে।
৩. থাইরয়েডের সমস্যা: থাইরয়েড হরমোনের অস্বাভাবিকতা চুল পাতলা হওয়া বা অতিরিক্ত চুল ঝরে পড়ার কারণ হতে পারে।
৪. ঘুমের অভাব: দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি চুলের স্বাস্থ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
৫. অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার: নিয়মিত হেয়ার কালার, স্ট্রেটনিং, রিবন্ডিং এবং অতিরিক্ত তাপ ব্যবহার চুলকে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে।
৬. বংশগত কারণ: পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে চুল পাতলা হওয়ার প্রবণতা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চুলের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে বয়স অনুযায়ী যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কয়েকটি সহজ অভ্যাস চুলের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখুন।
মাছ, ডিম, ডাল, বাদাম এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি খান।
চুলের ধরন অনুযায়ী মৃদু শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ব্যবহার করুন।
অতিরিক্ত গরম জল দিয়ে চুল ধোয়া এড়িয়ে চলুন।
ভেজা চুল খুব জোরে আঁচড়াবেন না।
নিয়মিত চুলে অতিরিক্ত তাপ ও রাসায়নিক প্রয়োগ কমিয়ে দিন।
পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন।
চুলের যত্নের পাশাপাশি মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখুন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছুটা চুল পাতলা হওয়া স্বাভাবিক হলেও হঠাৎ অতিরিক্ত চুল পড়া কখনও অবহেলা করা উচিত নয়।
যদি অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর চুল ঝরে যায়, মাথায় গোলাকার টাকের দাগ তৈরি হয়, মাথার ত্বকে চুলকানি বা প্রদাহ দেখা দেয় কিংবা চুলের ঘনত্ব দ্রুত কমতে থাকে, তাহলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রয়োজনে চিকিৎসক রক্তে আয়রনের মাত্রা, থাইরয়েডের কার্যকারিতা এবং অন্যান্য পুষ্টিগত বিষয় পরীক্ষা করতে পারেন। সমস্যার কারণ নির্ণয় করেই উপযুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণ করা উচিত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুলের ঘনত্ব, গঠন, কোঁকড়ানো ভাব এবং চুল পড়ার ধরনে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। তবে সব ধরনের চুল পড়াকে বয়সের স্বাভাবিক প্রভাব বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত যত্ন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য পাওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চুল পড়ার সমস্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সময় নষ্ট না করে তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা।
মনে রাখবেন, বয়স বাড়া আটকানো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক যত্নের মাধ্যমে চুলের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য অনেকটাই বজায় রাখা সম্ভব।