নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের দিকে ঝুঁকছেন বহু কৃষক। মাটির উর্বরতা বজায় রাখা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এবার কৃষকদের জন্য রয়েছে আরও একটি সম্ভাবনার খবর। সরকারি সহায়তায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি নিয়ে তৈরি করা যেতে পারে ভার্মি কম্পোস্ট ইউনিট। এর মাধ্যমে কৃষকরা নিজেদের জমির জন্য জৈব সার তৈরি করার পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদিত সার বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সুযোগও পেতে পারেন।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে এই ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাড়ির আশপাশে থাকা গোবর, শুকনো পাতা, ফসলের অবশিষ্টাংশ এবং অন্যান্য জৈব বর্জ্য ব্যবহার করেই তৈরি করা যায় উন্নতমানের কেঁচো সার। ফলে একদিকে যেমন কৃষিজ বর্জ্যের সঠিক ব্যবহার সম্ভব, অন্যদিকে রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমানো যায়।
ভার্মি কম্পোস্ট হল কেঁচোর সাহায্যে তৈরি এক ধরনের প্রাকৃতিক জৈব সার। কৃষিজ বর্জ্য, গোবর, শুকনো পাতা এবং পচনশীল জৈব পদার্থকে বিশেষ পদ্ধতিতে কেঁচোর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে এই সার তৈরি করা হয়।
এই সার মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি মাটির গঠন, জল ধারণক্ষমতা এবং উপকারী অণুজীবের কার্যকলাপ উন্নত করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি ভার্মি কম্পোস্ট ইউনিট তৈরি করা হলে নির্দিষ্ট পরিকাঠামোর মধ্যে নিয়মিত কেঁচো সার উৎপাদন করা সম্ভব। কৃষকরা নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত সার বিক্রির জন্যও উৎপাদন করতে পারেন।
ভার্মি কম্পোস্ট ইউনিট তৈরির ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্পের আওতায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার সুযোগ থাকতে পারে। এর ফলে কৃষকদের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করে ইউনিট তৈরি করতে হয় না।
ধরা যাক, কোনও অনুমোদিত প্রকল্পে একটি ইউনিট তৈরির যোগ্য ব্যয় ২০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হল। সেক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি অনুমোদিত হলে সরকারি সহায়তা হতে পারে ১০,০০০ টাকা। বাকি অর্থ কৃষককে বহন করতে হবে।
তবে এটি শুধুমাত্র বোঝানোর জন্য একটি কাল্পনিক হিসাব। প্রকৃত ভর্তুকির পরিমাণ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকল্প, ইউনিটের আকার, অনুমোদিত খরচ এবং উপভোক্তার যোগ্যতার উপর। প্রত্যেক কৃষক একই পরিমাণ অর্থ পাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ভার্মি কম্পোস্ট ইউনিট তৈরি করতে খুব বড় জায়গার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির পাশে বা কৃষিজমির কাছাকাছি উপযুক্ত জায়গায় এই ইউনিট তৈরি করা যেতে পারে।
সাধারণত ইটের তৈরি বেড, সিমেন্টের কাঠামো অথবা উপযুক্ত কম্পোস্টিং বেড ব্যবহার করা হয়। সেখানে গোবর, শুকনো পাতা, খড়কুটো, সবজির খোসা এবং অন্যান্য পচনশীল জৈব পদার্থ স্তরে স্তরে রাখা হয়।
এরপর নির্দিষ্ট প্রজাতির উপযুক্ত কেঁচো ছেড়ে দেওয়া হয়। পর্যাপ্ত আর্দ্রতা ও ছায়াযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখলে কেঁচো জৈব পদার্থকে ধীরে ধীরে উন্নতমানের কম্পোস্টে পরিণত করে।
তবে কাঁচা গোবর বা অতিরিক্ত গরম জৈব পদার্থ সরাসরি কেঁচোর সঙ্গে মেশানো উচিত নয়। উপযুক্তভাবে আগে থেকে পচিয়ে নেওয়া উপাদান ব্যবহার করতে হয়।
ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারের একাধিক সুবিধা রয়েছে। যেমন:
১. মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে।
২. মাটির গঠন ও জল ধারণক্ষমতা উন্নত করতে পারে।
৩. মাটির উপকারী অণুজীবের কার্যকলাপ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
৪. রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি করে।
৫. কৃষিজ বর্জ্যকে মূল্যবান জৈব সারে পরিণত করা যায়।
৬. ফল, সবজি, ফুল এবং বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা যায়।
৭. অতিরিক্ত উৎপাদিত সার বিক্রি করে কৃষকরা বাড়তি আয়ের সুযোগ পেতে পারেন।
গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে গোবর, শুকনো পাতা, খড়কুটো এবং সবজির অবশিষ্টাংশ জমা হয়। অনেক সময় এগুলি সঠিকভাবে ব্যবহার না করে ফেলে দেওয়া হয়।
কিন্তু এই সমস্ত জৈব উপাদানকে কাজে লাগিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করা সম্ভব। ফলে কৃষকের বাড়িতে পড়ে থাকা বর্জ্যই হয়ে উঠতে পারে মূল্যবান কৃষি উপকরণ।
যেসব কৃষকের গবাদি পশু রয়েছে, তাঁদের জন্য এই উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে। কারণ গোবর ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সরকারি প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য কৃষক, ছোট ও প্রান্তিক কৃষক এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কৃষক গোষ্ঠী বা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা এই ধরনের প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারেন।
তবে কোন শ্রেণির উপভোক্তা আবেদন করতে পারবেন, তা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নির্দেশিকার উপর নির্ভর করবে।
আবেদন করার আগে নিজের এলাকার কৃষি দফতর, ব্লক কৃষি দফতর অথবা উদ্যানপালন দফতরে যোগাযোগ করে বিস্তারিত তথ্য জেনে নেওয়া উচিত।
প্রকল্প অনুযায়ী সাধারণত নিম্নলিখিত নথিগুলি চাওয়া হতে পারে:
আধার কার্ড বা বৈধ পরিচয়পত্র।
কৃষকের পরিচয় বা কৃষি সংক্রান্ত নথি।
জমির দলিল অথবা জমি ব্যবহারের প্রমাণ, যেখানে প্রযোজ্য।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ।
পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
নির্ধারিত আবেদনপত্র।
ইউনিট তৈরির প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বা খরচের বিবরণ, যদি চাওয়া হয়।
প্রকল্পভেদে নথির তালিকা আলাদা হতে পারে।
যাঁরা ৫০ শতাংশ সরকারি ভর্তুকিতে ভার্মি কম্পোস্ট ইউনিট তৈরি করতে চান, তাঁরা প্রথমে নিজেদের এলাকার ব্লক কৃষি দফতরে যোগাযোগ করতে পারেন।
এছাড়াও জেলা কৃষি দফতর বা সংশ্লিষ্ট উদ্যানপালন দফতর থেকে প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা, আবেদনপদ্ধতি, ভর্তুকির পরিমাণ এবং প্রয়োজনীয় নথি সম্পর্কে জানতে পারবেন।
বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, ইউনিট তৈরির কাজ শুরু করার আগে সরকারি অনুমোদন বা পূর্বানুমতি প্রয়োজন কি না, তা অবশ্যই জেনে নিতে হবে। অনেক প্রকল্পে আগে আবেদন ও অনুমোদন না নিয়ে নির্মাণ শুরু করলে ভর্তুকি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।
বর্তমানে কৃষিকাজে উৎপাদন খরচ ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বীজ, সার, কীটনাশক এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক কৃষক সমস্যায় পড়েন। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের উদ্যোগে জৈব সার উৎপাদন করতে পারলে কৃষকদের খরচ কমানোর একটি বিকল্প তৈরি হতে পারে।
পাশাপাশি বাজারে জৈব সারের চাহিদা থাকলে অতিরিক্ত উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট বিক্রি করেও আয় করা সম্ভব। তবে এর জন্য সারের গুণমান বজায় রাখা, সঠিকভাবে প্যাকেজিং করা এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।
৫০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি আর্থিক সহায়তায় ভার্মি কম্পোস্ট ইউনিট তৈরির সুযোগ কৃষকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। এর মাধ্যমে কৃষিজ বর্জ্যের সঠিক ব্যবহার, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং জৈব সার উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় স্বনির্ভরতার নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
তবে আবেদন করার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর থেকে প্রকল্পটি বর্তমানে চালু রয়েছে কি না, ৫০ শতাংশ ভর্তুকি কোন শর্তে দেওয়া হচ্ছে এবং আবেদনের শেষ তারিখ কবে, তা যাচাই করে নিন। সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও অনুমোদিত নির্দেশিকাই হবে চূড়ান্ত তথ্যের ভিত্তি।