নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: কৃষকদের উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার এবার মিলতে পারে নতুন সমাধান। মাঠ থেকে ফসল তোলার পর সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারার কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফল ও সবজি নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে গরমের মরশুমে তাপমাত্রা বাড়লে অল্প সময়ের মধ্যেই পচে যেতে শুরু করে টমেটো, আলু, বেগুন, কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। একইভাবে কলা, আম, পেঁপে, পেয়ারা-সহ বিভিন্ন ফলও দীর্ঘদিন ভালো রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে বিদ্যুৎবিহীন ফল ও সবজি সংরক্ষণ প্রযুক্তি। বিশেষ ধরনের এই সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ খরচ ছাড়াই নির্দিষ্ট পরিবেশে কৃষিজ পণ্য তুলনামূলকভাবে বেশি সময় সতেজ রাখা সম্ভব। আর এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সরকারি প্রকল্পের আওতায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকির সুযোগের কথা সামনে আসায় কৃষক মহলে আগ্রহ বাড়তে পারে।
সাধারণত ফল ও সবজি দীর্ঘদিন ভালো রাখতে কোল্ড স্টোরেজ বা রেফ্রিজারেশনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের বহু কৃষকের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে কোল্ড স্টোরেজ তৈরি করা বা নিয়মিত বিদ্যুতের খরচ বহন করা সম্ভব হয় না।
এই সমস্যার বিকল্প হিসেবে রয়েছে বাষ্পীভবন-ভিত্তিক শীতলীকরণ প্রযুক্তি। বিশেষ করে 'জিরো এনার্জি কুল চেম্বার' বা Zero Energy Cool Chamber নামে পরিচিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ছাড়াই ফল ও সবজি সংরক্ষণ করা যায়।
এই ব্যবস্থায় সাধারণত ইট, বালি এবং জল ব্যবহার করে একটি বিশেষ ধরনের সংরক্ষণ কক্ষ তৈরি করা হয়। কক্ষের দেওয়ালের মাঝখানে ভেজা বালি রাখা হয়। সেই বালির জল বাষ্পীভূত হওয়ার সময় আশপাশ থেকে তাপ শোষণ করে। ফলে সংরক্ষণ কক্ষের ভিতরের তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় কমে যায় এবং আর্দ্রতা বজায় থাকে।
এর ফলে অনেক ধরনের ফল ও সবজি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া বা পচে যাওয়ার হাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা পায়।
এই প্রযুক্তির সঙ্গে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি ভর্তুকির বিষয়টি কৃষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থে সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকারি ভর্তুকির প্রকল্প থাকলে কৃষকদের প্রাথমিক বিনিয়োগের বোঝা অনেকটাই কমতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, ৮০ শতাংশ ভর্তুকি সব প্রকল্প, সব রাজ্য বা প্রত্যেক আবেদনকারীর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়। প্রকৃত ভর্তুকির পরিমাণ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নির্দেশিকা, অনুমোদিত নির্মাণ ব্যয়, উপভোক্তার যোগ্যতা এবং সরকারি বরাদ্দের উপর।
তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট কৃষি দফতর বা উদ্যানপালন দফতর থেকে প্রকল্পের বর্তমান নিয়ম জেনে নেওয়া জরুরি।
এই ধরনের শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের কৃষিজ পণ্য রাখা যেতে পারে। যেমন:
টমেটো, বেগুন, কাঁচালঙ্কা ও ঢ্যাঁড়শ।
পটল, শসা, ফুলকপি ও বাঁধাকপি।
আম, পেয়ারা, কলা ও পেঁপে।
বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফল।
তবে প্রতিটি ফসলের সংরক্ষণের উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার চাহিদা আলাদা। তাই সব ধরনের ফল ও সবজি একই সময় পর্যন্ত সতেজ থাকবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
গ্রামের বহু কৃষক প্রতিদিন সকালে জমি থেকে সবজি তুলে বাজারে বিক্রি করতে যান। কিন্তু বাজারে দাম কম থাকলে অনেক সময় তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। কারণ বাড়িতে দীর্ঘক্ষণ ফসল ভালো রাখার মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকে না।
ফলে কম দামে ফসল বিক্রি করা ছাড়া তাঁদের সামনে অন্য কোনও উপায় থাকে না। আবার কিছু ফসল বিক্রি না হলে পচে নষ্ট হয়ে যায়।
বিদ্যুৎবিহীন সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারলে কৃষকরা তুলনামূলকভাবে বেশি সময় ফসল ভালো রাখতে পারবেন। বাজারে দাম কম থাকলে কিছুটা অপেক্ষা করে ভালো দামে বিক্রির সুযোগও তৈরি হতে পারে। এতে ফসলের অপচয় কমানোর পাশাপাশি কৃষকের আর্থিক ক্ষতিও কিছুটা কমানো সম্ভব।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এর কার্যক্রমের জন্য সাধারণত বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। ফলে বিদ্যুতের বিল বা বিদ্যুৎ সংযোগের উপর নির্ভরশীলতা কমে যায়।
পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এমন কিছু নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেই এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। তবে নিয়মিত জল দেওয়া, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং উপযুক্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যাঁরা এই ধরনের সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করতে আগ্রহী, তাঁরা নিজেদের এলাকার কৃষি দফতর, ব্লক কৃষি দফতর অথবা উদ্যানপালন দফতরে যোগাযোগ করতে পারেন।
সেখানে জানতে হবে:
১. বর্তমানে এই প্রযুক্তির জন্য কোনও সরকারি ভর্তুকি প্রকল্প চালু রয়েছে কি না।
২. প্রকল্পের আওতায় সর্বোচ্চ কত শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।
৩. ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা আবেদন করতে পারবেন কি না।
৪. আবেদন করার জন্য কী কী নথি প্রয়োজন।
৫. নির্মাণের আগে সরকারি অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক কি না।
সাধারণত কৃষকের পরিচয়পত্র, জমির নথি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় আবেদনপত্র লাগতে পারে। তবে নির্দিষ্ট নথির তালিকা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নির্দেশিকা অনুযায়ী জানতে হবে।
বর্তমানে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল সঠিকভাবে সংরক্ষণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু বেশি ফসল উৎপাদন করলেই হবে না, সেই ফসল যাতে নষ্ট না হয় এবং কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পান, তার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি করাও জরুরি।
বিদ্যুৎবিহীন শীতল সংরক্ষণ প্রযুক্তি সেই লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে ছোট কৃষক, সবজি চাষি এবং ফল উৎপাদনকারীদের কাছে এই প্রযুক্তি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।