নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ম্যাচের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৭২ রান সংগ্রহ করেছিল। দলের হয়ে শাদমান ইসলাম করেন গুরুত্বপূর্ণ ১০৫ রান। তাঁর ইনিংস বাংলাদেশের স্কোরকে সম্মানজনক জায়গায় পৌঁছে দেয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে জোমেল ওয়ারিকান ৫৩ রান দিয়ে পাঁচটি উইকেট নেন। ফলে প্রথম ইনিংসেই ক্যারিবীয় স্পিনাররা নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেন।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ একসময় ভালো অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল। তৃতীয় দিনের খেলা শুরু হওয়ার সময় তাদের স্কোর ছিল ৪ উইকেটে ১৩৪ রান। দিনের শুরুতে তাগেনারাইন চন্দরপল ও জাস্টিন গ্রিভস বেশ কিছুক্ষণ উইকেটে টিকে থেকে বাংলাদেশের বোলারদের পরীক্ষা নেন। চন্দরপল করেন ৫৬ রান। গ্রিভসের ব্যাট থেকে আসে ৪৬ রান। তাঁদের জুটি ভাঙার পরও অধিনায়ক রস্টন চেজ লড়াই চালিয়ে যান।
তবে নাঈম হাসানের স্পিনে শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস ২৪৫ রানে থেমে যায়। নাঈম ৩৩ রান দিয়ে চারটি উইকেট নেন। মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম দুটি করে উইকেট পান। ফলে প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের সামান্য লিড পায় বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ শুরু থেকেই চাপে পড়ে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা নিয়ন্ত্রিত লাইন ও লেংথে বল করে স্বাগতিক ব্যাটারদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে দেননি। বিশেষ করে অধিনায়ক রস্টন চেজের অফস্পিন বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে বড় ধাক্কা দেয়।
শাদমান ইসলাম প্রথম ইনিংসে শতরান করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩ রানের বেশি করতে পারেননি। চেজের বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন তিনি। এরপর দ্রুত ফিরে যান তাওহিদ হৃদয় ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। হৃদয় কোনও রান করতে পারেননি। শান্ত করেন ১০ রান। চেজ অল্প সময়ের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দেন।
অন্যদিকে জোমেল ওয়ারিকানও নিজের অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন। তিনি লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজকে ফিরিয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেন। একসময় মাত্র ৫৩ রানে ছয় উইকেট হারিয়ে ফেলে স্বাগতিক দল।
তৃতীয় দিনের শেষে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ৭৯ রান। নাঈম হাসান ও জাকের আলি ১৮ রান করে অপরাজিত ছিলেন। মোমিনুল হকের চোটের কারণে জাকের আলি কনকাশন পরিবর্ত হিসেবে ব্যাট করতে নামেন। তাঁদের জুটি দিনের শেষদিকে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
দিনের খেলা শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং কোচ ফ্লয়েড রেইফার জানান, তাঁর দল ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাঁর মতে, বোলাররা পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট জায়গায় বল করেছেন এবং প্রত্যেকে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের লিড পুরোপুরি মুছে দিতে না পারলেও দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে ক্যারিবীয় দল।
রেইফারের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে প্রায় ১২৫ রানের লক্ষ্যও রাখে, তা হলে সেই রান তাড়া করা সম্ভব বলে মনে করছে দল। তবে তার জন্য শুরুতেই উইকেট হারানো চলবে না। চতুর্থ দিনে ব্যাটারদের ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে খেলতে হবে এবং প্রতিটি রান সংগ্রহের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স। প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়া ওয়ারিকান দ্বিতীয় ইনিংসেও গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছেন। অধিনায়ক চেজও ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই দলের জন্য অবদান রেখেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বোলিং আক্রমণ বাংলাদেশের ব্যাটারদের ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি করেছে।
চতুর্থ দিনের শুরুতে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হবে যতটা সম্ভব রান বাড়ানো। হাতে রয়েছে চারটি উইকেট। নাঈম হাসান ও জাকের আলির জুটি যদি কিছুটা দীর্ঘ হয়, তা হলে বাংলাদেশের লিড বাড়তে পারে। এরপর হাসান মাহমুদ, তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলামের কাছ থেকেও কিছু রান পাওয়ার আশা থাকবে।
বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ ও টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উইকেটে টিকে থাকা। অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি না নিয়ে বলের গুণমান বুঝে খেলা প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন দিনের শুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে মাঠে নামবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ চাইবে দিনের শুরুতেই বাকি উইকেটগুলো তুলে নিতে। বাংলাদেশের লিড যত কম রাখা যাবে, রান তাড়া করার কাজ তত সহজ হবে। তবে মিরপুরের পিচে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করা সহজ হবে কি না, তা নির্ভর করবে পিচের অবস্থা, বলের ঘূর্ণন এবং দুই দলের বোলারদের পারফরম্যান্সের ওপর।
মিরপুরের উইকেটে ম্যাচের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্পিনারদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রথম ইনিংসেই জোমেল ওয়ারিকান পাঁচ উইকেট নিয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে নাঈম হাসানও চার উইকেট পেয়েছেন। দ্বিতীয় ইনিংসে চেজ ও ওয়ারিকানের সাফল্য প্রমাণ করেছে, এই পিচে স্পিন বোলিং ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
এ ছাড়া আলো ও আবহাওয়ার কারণে আগের দিনগুলোতে খেলা ব্যাহত হয়েছে। তৃতীয় দিনেও খারাপ আলোর কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই খেলা বন্ধ করতে হয়। ফলে চতুর্থ দিনে পূর্ণ সময় খেলা সম্ভব হবে কি না, সেটিও ম্যাচের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃতীয় দিনের শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিজেদের ভালো অবস্থানে মনে করলেও ম্যাচের ফল এখনও নিশ্চিত নয়। বাংলাদেশের হাতে চারটি উইকেট রয়েছে এবং লিডও একশো রানের বেশি। নাঈম ও জাকের যদি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন, তা হলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে ক্যারিবীয় দল দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে ছোট লক্ষ্য পেলে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করবে। তাই চতুর্থ দিনের প্রথম সেশনই এই টেস্টের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাটাররা কতক্ষণ প্রতিরোধ গড়তে পারেন এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা কত দ্রুত শেষ চারটি উইকেট তুলে নিতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করছে ম্যাচের পরবর্তী অধ্যায়।
মিরপুর টেস্টে এখন দুই দলের সামনে আলাদা চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ চাইবে নিজেদের লিড আরও বাড়িয়ে বোলারদের হাতে লড়াই করার মতো পুঁজি তুলে দিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ চাইবে দ্রুত ইনিংস শেষ করে লক্ষ্য তাড়া করতে নামতে। চতুর্থ দিনের ক্রিকেট তাই দুই দলের ধৈর্য, কৌশল ও চাপ সামলানোর ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে চলেছে।