নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: কালীপুজো মানেই মা কালীর আরাধনা, আর সেই আরাধনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ লাল জবা ফুল। শ্যামা মায়ের পুজোয় জবা ফুলের বিশেষ কদর রয়েছে। তাই কালীপুজো এলেই বাজারে লাল জবার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পুজোর আগেই ফুলের বাজারে শুরু হয় ব্যস্ততা। ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় ফুল বিক্রেতাদের। চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকলে বেড়ে যায় দামও। এবারের কালীপুজোতেও জবা ফুলের চড়া দাম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন বাজারে। কিন্তু ফুলের দাম বাড়লেও বাংলার ফুলচাষিদের একাংশের চিন্তা কাটছে না।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও শাক্ত উপাসনায় লাল জবা ফুলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মা কালীর আরাধনায় এই ফুল অন্যতম প্রধান পুজোর উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেবী কালীর সঙ্গে লাল জবা ফুলের সম্পর্ক বহুদিনের। ভক্তদের বিশ্বাস, লাল জবা নিবেদন করে মা কালীর পুজো করলে দেবীর আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
শুধু কালীপুজো নয়, বছরের অন্যান্য সময়েও বিভিন্ন মন্দিরে এবং বাড়ির পুজোয় জবা ফুলের চাহিদা থাকে। তবে কালীপুজোর সময় এই চাহিদা অনেকটাই বেড়ে যায়। বিশেষ করে বড় বড় পুজো মণ্ডপ, মন্দির এবং ব্যক্তিগত পুজোর জন্য প্রচুর পরিমাণে জবা ফুল কেনা হয়।
কালীপুজোর আগে থেকেই ফুলের বাজারে জবার চাহিদা বাড়তে শুরু করে। পুজোর দিন যত এগিয়ে আসে, ততই বাড়ে ক্রেতাদের ভিড়। ফলে অনেক বাজারে জবা ফুলের দাম সাধারণ দিনের তুলনায় বেশি হতে দেখা যায়।
জবা ফুলের দাম নির্ভর করে ফুলের আকার, গুণমান, সতেজতা, জোগান এবং স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতির উপর। পুজোর সময় চাহিদা বেশি থাকায় ব্যবসায়ীরাও বেশি দামে ফুল বিক্রি করেন। অনেক ক্ষেত্রে ভোর থেকেই ফুলের বাজারে ক্রেতাদের ভিড় জমে যায়। পুজোর প্রয়োজন মেটাতে অনেকেই বেশি দাম দিয়েও জবা ফুল কিনতে বাধ্য হন।
সাধারণভাবে ফুলের দাম বাড়লে ফুলচাষিদের লাভ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ছবিটা সব সময় এক রকম হয় না। বাজারে জবা ফুলের খুচরো দাম বাড়লেও তার সম্পূর্ণ সুফল চাষিদের হাতে পৌঁছয় না।
ফুলচাষিদের সামনে রয়েছে একাধিক সমস্যা। চাষের খরচ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, জমির পরিচর্যা এবং পরিবহণ খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। তার উপর আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা ফুল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি করে।
অতিরিক্ত বৃষ্টি, জল জমে যাওয়া, তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং পোকামাকড়ের আক্রমণে ফুলের গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে উৎপাদন কমে গেলে বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও চাষিরা পর্যাপ্ত ফুল সরবরাহ করতে পারেন না।
অন্যদিকে, ফুল অত্যন্ত পচনশীল পণ্য। সময়মতো বিক্রি করতে না পারলে ফুল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অনেক সময় বাজারে ভালো দাম পাওয়ার অপেক্ষা না করে চাষিদের কম দামে ফুল বিক্রি করতে হয়।
ফুলচাষ থেকে বাজার পর্যন্ত পৌঁছনোর পথে একাধিক স্তর রয়েছে। চাষিরা অনেক সময় পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে ফুল বিক্রি করেন। এরপর সেই ফুল খুচরো বাজারে পৌঁছয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবহণ ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়।
ফলে চাষিরা যে দামে ফুল বিক্রি করেন, ক্রেতাদের অনেক সময় তার চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতে হয়। অর্থাৎ বাজারে ফুলের দাম বাড়লেও তার পুরো লাভ উৎপাদক কৃষকদের কাছে পৌঁছয় না। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং সরাসরি বাজারে ফুল বিক্রির সুযোগ বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই ফুলচাষিদের আলোচনায় রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ফুলচাষ বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় ফুলচাষের সঙ্গে বহু পরিবার যুক্ত রয়েছে। গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা, জবা-সহ বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁরা।
কালীপুজো, দুর্গাপুজো, সরস্বতী পুজো এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় ফুলের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সারা বছর ফুলচাষিদের আয় এক রকম থাকে না। বাজারের ওঠানামা, উৎপাদন খরচ এবং আবহাওয়ার সমস্যার কারণে তাঁদের আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
ফুলচাষিদের সুবিধার্থে উন্নত চাষের প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণের ব্যবস্থা, পরিবহণে সহায়তা এবং সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ফুলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কালীপুজোর রাতে যখন মায়ের মন্দির ও পুজো মণ্ডপ লাল জবা ফুলে সেজে ওঠে, তখন সেই ফুলের পিছনে লুকিয়ে থাকে বহু চাষির পরিশ্রম। একটি সুন্দর ও সতেজ ফুল বাজারে পৌঁছে দিতে তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে গাছের পরিচর্যা করতে হয়।
তাই কালীপুজোয় জবা ফুলের চাহিদা ও দাম বাড়ার পাশাপাশি ফুলচাষিদের আর্থিক অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। বাজারে দাম বাড়লেই যে কৃষকের লাভ বাড়বে, এমন নয়। উৎপাদক থেকে ক্রেতা পর্যন্ত গোটা বাজার ব্যবস্থায় ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে তবেই প্রকৃত অর্থে লাভবান হবেন বাংলার ফুলচাষিরা।
কালীপুজোয় জবা ফুলের কদর যেমন বাড়ছে, তেমনই সামনে আসছে বাংলার ফুলচাষিদের নানা সমস্যা। মা কালীর আরাধনায় যে লাল জবা অপরিহার্য, সেই জবা ফুলের চাষিদের মুখেও হাসি ফোটাতে প্রয়োজন যথাযথ সরকারি সহায়তা, ন্যায্য বাজারদর এবং উন্নত বিপণন ব্যবস্থা।