সম্পাদকের কলমে :বিভিন্ন পুজো-পার্বণ, উৎসব কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে একটি দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে। অনুষ্ঠান উপলক্ষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে অসহায় ও দুঃস্থ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন বস্ত্র। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। উৎসবের আনন্দ সমাজের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার এমন প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। কিন্তু এই ভালো কাজের সঙ্গে যখন জুড়ে যায় ছবি তোলা, ভিডিও করা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের প্রতিযোগিতা, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন সামনে আসে।
যাঁরা বস্ত্র বিতরণ করছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন—এই উদ্যোগ কি সত্যিই অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, নাকি নিজেদের সামাজিক পরিচিতি ও প্রচার বাড়ানোর জন্য? ভালো কাজের স্বীকৃতি পাওয়া কি এতটাই জরুরি যে সাহায্য গ্রহণকারী মানুষটির হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়ার মুহূর্তটিও ক্যামেরাবন্দি করতে হবে?
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কোনও অনুষ্ঠান বা সামাজিক উদ্যোগের ছবি মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন পুজো কমিটি, ক্লাব কিংবা সামাজিক সংগঠন বস্ত্র বিতরণের ছবি পোস্ট করে নিজেদের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে। কোথাও দেখা যায় সারিবদ্ধভাবে অসহায় মানুষদের দাঁড় করিয়ে বস্ত্র দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও ছবি তোলার জন্য বিশেষভাবে সাজানো হচ্ছে গোটা অনুষ্ঠান। অনেক সময় সাহায্য গ্রহণকারী মানুষের মুখও প্রকাশ্যে চলে আসছে। অথচ যাঁরা সাহায্য নিচ্ছেন, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্মান ও আত্মমর্যাদার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও ভালো কাজের ছবি প্রকাশ করলেই যে সেটি প্রচারের উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, এমনটা বলা যায় না। অনেক সময় একটি উদ্যোগের ছবি অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করে। অন্য কোনও সংগঠন বা ব্যক্তি সেই ছবি দেখে সমাজসেবামূলক কাজে এগিয়ে আসতে পারেন। ফলে সামাজিক কাজের প্রচারেরও ইতিবাচক ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু প্রচার যেন কখনও মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে না যায়।
আসল প্রশ্নটা সেখানেই। একজন অসহায় মানুষের হাতে নতুন পোশাক তুলে দেওয়ার সময় তাঁর মুখের হাসিটাই কি যথেষ্ট নয়? সেই মুহূর্তকে ক্যামেরায় বন্দি করে হাজার মানুষের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন কতটা? যদি সত্যিই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থাকে, তাহলে ক্যামেরা, সংবাদমাধ্যম কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার উপস্থিতি ছাড়াও তো সাহায্য করা সম্ভব।
অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা নিঃশব্দে অন্যের পাশে দাঁড়ান। কোনও প্রচার চান না, নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চান না। উৎসবের আগে দরিদ্র পরিবারের বাড়িতে নতুন পোশাক পৌঁছে দেন, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন কিংবা বিপদে পড়া কোনও পরিবারের পাশে দাঁড়ান। তাঁদের কাজ হয়তো কোনও সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় জায়গা পায় না, কিন্তু যাঁরা সাহায্য পান, তাঁদের জীবনে সেই সহযোগিতার মূল্য অনেক বেশি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বস্ত্র বিতরণের সময় সাহায্য গ্রহণকারী মানুষের সম্মান বজায় রাখা। দারিদ্র্য কোনও লজ্জার বিষয় নয়। কিন্তু কারও অসহায় অবস্থাকে প্রচারের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা কখনওই কাম্য নয়। সাহায্য করতে গিয়ে যেন কারও আত্মসম্মানে আঘাত না লাগে, সেদিকেও উদ্যোক্তাদের নজর রাখা উচিত।
উৎসবের আনন্দ সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়াই হওয়া উচিত বস্ত্র বিতরণের মূল লক্ষ্য। সেখানে কে কত বড় অনুষ্ঠান করলেন, কতজনের হাতে বস্ত্র তুলে দিলেন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কতগুলি ছবি প্রকাশ করলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল প্রকৃত প্রয়োজনের সময় কতজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো গেল।
ভালো কাজের স্বীকৃতি মানুষের ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু সেই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য অসহায় মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসার প্রয়োজন নেই। প্রকৃত মানবিকতা অনেক সময় প্রচারের আড়ালেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকে।
তাই বিভিন্ন পুজো কমিটি, ক্লাব এবং সামাজিক সংগঠনের উদ্যোক্তাদের কাছে একটাই আবেদন—বস্ত্র বিতরণ করুন, মানুষের পাশে দাঁড়ান, উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিন। তবে চেষ্টা করুন সাহায্য গ্রহণকারী মানুষের মর্যাদা ও গোপনীয়তা বজায় রাখতে। ছবি তুলতেই হলে তাঁর সম্মতি নিন। কারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বড় কথা, সেই কাজের প্রচার নয়।
মনে রাখা দরকার, ক্যামেরার সামনে বস্ত্র তুলে দেওয়া সহজ, কিন্তু ক্যামেরার আড়ালে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই প্রকৃত মানবিকতার পরিচয়। ভালো কাজের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক বা কমেন্ট নয়, একজন অসহায় মানুষের মুখের আন্তরিক হাসি।