নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: চুরির কৌশল দেখে কার্যত হতবাক দুর্গাপুরের একটি অভিজাত আবাসনের বাসিন্দারা। দরজার সামনে আঁকা লক্ষ্মীর আল্পনা পর্যন্ত ডিঙিয়ে ফ্ল্যাটে চুরি করতে ঢুকল চার দুষ্কৃতী! কারও হাতে লোহার রড, কারও হাতে ঘাস কাটার কাস্তে। প্রত্যেকের মুখ ঢাকা, হাতে হলুদ গ্লাভস এবং পায়ে মোজা। আবাসনের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে দুষ্কৃতীদের এই অদ্ভুত ও রহস্যজনক গতিবিধি। ফুটেজ সামনে আসতেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে আবাসিকদের মধ্যে।
ঘটনাটি দুর্গাপুর শহরের একটি অভিজাত আবাসনের। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, গভীর রাতে চারজনের একটি দল অত্যন্ত সতর্কভাবে আবাসনের করিডোর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের মুখ কাপড়ে ঢাকা। হাতে গ্লাভস, পায়ে মোজা। চলার সময় যাতে কোনও শব্দ না হয়, সেই কারণেই পায়ে মোজা ব্যবহার করা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। আবার হাতে গ্লাভস থাকার কারণে আঙুলের ছাপ না পড়ার পরিকল্পনাও থাকতে পারে বলে সন্দেহ।
কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে অন্য একটি বিষয়। আবাসনের করিডোরে দরজার সামনে সুন্দর করে আঁকা ছিল লক্ষ্মীর আল্পনা। সেই আল্পনার উপর দিয়ে না হেঁটে সেটি ডিঙিয়ে এগিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। চুরির উদ্দেশ্যে এলেও আল্পনা এড়িয়ে যাওয়ার এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত আবাসনের বাসিন্দারা। চোরেরাও কি ধর্মীয় বিশ্বাস বা আচারকে এভাবে গুরুত্ব দেয়? ফুটেজ সামনে আসার পর এমন প্রশ্নও উঠছে।
তবে এই চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বড় রহস্য তৈরি হয়েছে দুষ্কৃতীদের নির্দিষ্ট তিনটি ফ্ল্যাট বেছে নেওয়া নিয়ে। আবাসনে একাধিক ফ্ল্যাট থাকা সত্ত্বেও চারজনের দলটি মাত্র তিনটি ফ্ল্যাটকে নিশানা করে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, যে তিনটি ফ্ল্যাটে চুরির ঘটনা ঘটেছে, সেই ফ্ল্যাটগুলির মালিকেরা কেউই ঘটনার সময় বাড়িতে ছিলেন না।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, দুষ্কৃতীরা কি আগে থেকেই জানত কোন কোন ফ্ল্যাটের মালিক বাড়িতে থাকবেন না? নাকি বেশ কিছুদিন ধরে আবাসনের বাসিন্দাদের গতিবিধির উপর নজর রাখছিল তারা? আবাসনের ভিতরের কেউ তাদের তথ্য সরবরাহ করেছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিতে পারছেন না বাসিন্দারা। আবার ফেরিওয়ালা কিংবা অন্য কোনও পরিচয়ে দিনের বেলায় আবাসনে ঢুকে আগে থেকে রেকি করে যাওয়ার সম্ভাবনাও সামনে আসছে।
দুষ্কৃতীদের চুরির ধরন দেখে আরও কয়েকটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মুখ ঢাকা, হাতে গ্লাভস, পায়ে মোজা এবং সঙ্গে ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড—সব মিলিয়ে গোটা পরিকল্পনায় যথেষ্ট সতর্কতার ছাপ রয়েছে। তবে তারা কোনও সংগঠিত চক্রের সদস্য কি না, তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।
ঘটনার পর আবাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে তৎপর হয়েছে প্রশাসন। পুলিশের নির্দেশে পুরনো নিরাপত্তারক্ষীদের সরিয়ে নতুন ও দক্ষ নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি আবাসনের বাউন্ডারি ওয়ালের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া ও অতিরিক্ত ফেন্সিং বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। যাতে কোনওভাবেই বাইরের দুষ্কৃতীরা সহজে আবাসনের ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে, সেদিকেই বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, আবাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আরও বেশি সংখ্যক সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, করিডোর এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ চলছে।
এখন তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া চার দুষ্কৃতীকে শনাক্ত করা। তারা কীভাবে আবাসনে প্রবেশ করেছিল, কোন পথে বেরিয়ে গিয়েছিল এবং চুরির আগে কোনওভাবে আবাসনের ভিতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দুর্গাপুরের এই চুরির ঘটনা আবাসিক নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকের অনুপস্থিতির বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আল্পনা ডিঙিয়ে, মুখ ঢেকে, হাতে কাস্তে ও লোহার রড নিয়ে আসা এই চার দুষ্কৃতীকে সিসিটিভির সূত্র ধরে পুলিশ কত দ্রুত শনাক্ত করতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আবাসনের বাসিন্দারা।