নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ক্যানসার শব্দটি শুনলেই স্বাভাবিকভাবে মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে ক্যানসারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্তের ক্যানসারের একটি বিশেষ ধরন হলো লিম্ফোমা। এই রোগ শরীরের লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম বা লসিকাতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। আশঙ্কার বিষয়, লিম্ফোমার প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ শারীরিক সমস্যার মতো মনে হতে পারে। ফলে রোগের উপসর্গ দেখা দিলেও অনেকেই প্রথমদিকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।
চিকিৎসকদের মতে, লিম্ফোমা সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ, রোগের ধরন, পর্যায় এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।
লিম্ফোমা হলো এক ধরনের ক্যানসার, যা শরীরের লিম্ফোসাইট নামক শ্বেত রক্তকণিকাকে প্রভাবিত করে। লিম্ফোসাইট আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলি সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
শরীরের লিম্ফ নোড বা লসিকাগ্রন্থি, প্লীহা, অস্থিমজ্জা এবং লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের অন্যান্য অংশে এই রোগ দেখা দিতে পারে। অস্বাভাবিকভাবে লিম্ফোসাইটের বৃদ্ধি ও বিভাজনের ফলে লিম্ফোমা তৈরি হয়।
সাধারণভাবে লিম্ফোমাকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমটি হলো হজকিন লিম্ফোমা এবং দ্বিতীয়টি নন-হজকিন লিম্ফোমা। এই দুই ধরনের রোগের বৈশিষ্ট্য, বিস্তারের ধরন এবং চিকিৎসার পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।
লিম্ফোমার সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো শরীরের বিভিন্ন অংশে লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া। বিশেষ করে গলা, বগল অথবা কুঁচকির কাছে ব্যথাহীন ফোলা বা গাঁট দেখা দিতে পারে।
তবে সব ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। অনেক সময় রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনও স্পষ্ট উপসর্গও থাকে না।
লিম্ফোমার সম্ভাব্য কয়েকটি লক্ষণ হলো—
১. লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া: গলা, বগল বা কুঁচকিতে ব্যথাহীন গাঁট বা ফোলা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই ফোলা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
২. অকারণে জ্বর: কোনও স্পষ্ট সংক্রমণ ছাড়াই বারবার জ্বর আসতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে জ্বর থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
৩. রাতে অতিরিক্ত ঘাম: ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বেশি ঘাম হওয়া, এমনকি পোশাক বা বিছানার চাদর ভিজে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও দেখা দিতে পারে।
৪. অকারণে ওজন কমে যাওয়া: খাদ্যাভ্যাস বা শরীরচর্চায় কোনও পরিবর্তন না করেও দ্রুত ওজন কমতে পারে।
৫. দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি: পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরেও সারাক্ষণ ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভূত হতে পারে।
৬. চুলকানি: শরীরের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি দেখা দিতে পারে। কখনও কোনও দৃশ্যমান ফুসকুড়ি ছাড়াই এই সমস্যা হতে পারে।
৭. কাশি ও শ্বাসকষ্ট: বুকের ভেতরের লিম্ফ নোড বড় হয়ে গেলে কাশি, বুকে চাপ বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
লিম্ফোমার প্রাথমিক উপসর্গগুলির অনেকগুলিই সাধারণ অসুস্থতার সঙ্গে মিলে যায়। যেমন, জ্বর, ক্লান্তি, ঘাম বা লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়ার পেছনে সাধারণ সংক্রমণসহ নানা কারণ থাকতে পারে।
তাই শুধুমাত্র এই লক্ষণগুলি দেখেই লিম্ফোমা হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আবার উপসর্গ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা ক্রমশ বাড়তে থাকলে অবহেলা করাও ঠিক নয়।
লিম্ফোমা শনাক্ত করার জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর শারীরিক পরীক্ষা এবং চিকিৎসার ইতিহাস পর্যালোচনা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পরীক্ষা করা হতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে—
রক্ত পরীক্ষা: রক্তের বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বায়োপসি: সন্দেহজনক লিম্ফ নোড বা টিস্যুর নমুনা পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা হয়। লিম্ফোমা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিটি স্ক্যান ও পিইটি-সিটি: শরীরের কোথায় এবং কতটা অংশে রোগ ছড়িয়েছে, তা বুঝতে সাহায্য করে।
অস্থিমজ্জা পরীক্ষা: নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জায় রোগের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হতে পারে।
লিম্ফোমার চিকিৎসা রোগের ধরন, পর্যায়, রোগীর বয়স এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। চিকিৎসার জন্য কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং রেডিয়েশন থেরাপির মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে।
কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ধীরগতির লিম্ফোমার ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রথমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শও দিতে পারেন। অন্যদিকে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া লিম্ফোমার ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন হতে পারে।
তাই রোগ শনাক্ত হওয়ার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গলা, বগল বা কুঁচকিতে অকারণে গাঁট দেখা দিলে, দীর্ঘদিন জ্বর থাকলে, রাতে অতিরিক্ত ঘাম হলে কিংবা অকারণে ওজন কমতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে একাধিক উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে দেরি না করাই ভালো।
লিম্ফোমা একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্তের ক্যানসার হলেও এর লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সময়মতো রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি। শরীরের কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে দীর্ঘদিন অবহেলা করবেন না। মনে রাখতে হবে, এই উপসর্গগুলির অর্থ সবসময় ক্যানসার নয়। সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শই রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা দিতে পারে।