Home ফ্যাক্ট ফাইল পঞ্চায়েতের পাঁচ কাহন পৌর বার্তা জেলার চালচিত্র চাষী ভাই বলছি শরীর স্বাস্থ্য জেলার সেনাপতি মাঠে ময়দানে বিনোদন সম্পাদকীয় কলম
BREAKING NEWS
বহরমপুরের ভাকুড়ির বকুলতলায় প্রাচীন মায়ের মন্দিরে ভক্তদের ঢল, উলুধ্বনি ও ঢাকের আওয়াজে মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণ   •   বস্ত্র বিতরণ, নাকি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের হাতিয়ার? মানবিকতার আসল পরিচয় কি ছবির ফ্রেমে, নাকি নিঃস্বার্থ সাহায্যে?   •   আল্পনা ডিঙিয়ে ফ্ল্যাটে চুরি! হলুদ গ্লাভস, মুখ ঢাকা, হাতে কাস্তে-লোহার রড নিয়ে চার দুষ্কৃতী, সিসিটিভি দেখে হতবাক দুর্গাপুর   •   দূষণে শ্বাসরুদ্ধ কলকাতা! শহর কি ফের পরিণত হচ্ছে ‘যক্ষ্মা নগরী’তে? বায়ুদূষণ নিয়ে সরব অধীর রঞ্জন চৌধুরী   •   গড়িয়ায় লিভ-ইন পার্টনারকে কুপিয়ে খুন! গ্রেফতার তরুণী ও তাঁর মা, চাঞ্চল্য ফর্তাবাদে   •   মন্দিরবাজারে ‘নবকালী’ থিমে নজরকাড়া শ্যামাপুজো, স্বামীজি সংঘের উদ্যোগে দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ

দুর্গাপুরের অম্বুজার জঙ্গলে লুকিয়ে ভারত মাতার মন্দির! বন্দেমাতরম মন্ত্রে পূজিত হন মা কালী

08 Nov 2026
05:03 AM


নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক:  চারদিকে আধুনিক অট্টালিকা, ঝাঁ চকচকে রাস্তা আর শহুরে ব্যস্ততা। তারই মাঝে দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারের অম্বুজা নগরীর ভিতরে যেন ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি প্রাচীন কালীমন্দির। স্থানীয় মানুষের কাছে এই মন্দির পরিচিত ‘ভারত মাতার মন্দির’ নামে। এখানে দেবী কালী পূজিত হন ভারত মাতা রূপে। আর পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব হলো—প্রচলিত মন্ত্রের পাশাপাশি বন্দেমাতরম ধ্বনির মাধ্যমে দেবীর আরাধনা।

মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা লোককথা, ইতিহাসের স্মৃতি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের কাহিনি। মন্দিরের সেবাইতদের দাবি, একসময় এই এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। ডাকাতদের উপদ্রবের কারণে সাধারণ মানুষ সহজে এই এলাকায় আসতে সাহস পেতেন না। সেই জঙ্গলের মধ্যেই ছিল একটি প্রাচীন, ভগ্নপ্রায় কালীমন্দির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরটি ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা জনশ্রুতি। অনেকে এই মন্দিরকে ভবানী পাঠকের মন্দির বলেও উল্লেখ করেন।

লোককথায় ভবানী পাঠক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি

স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, এই মন্দিরের ইতিহাস পাল-সেন আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। কথিত রয়েছে, ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর সঙ্গে এই স্থানের যোগসূত্র ছিল। এমনকি স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিপ্লবীরাও নাকি এই জঙ্গলের নির্জন পরিবেশকে গোপন বৈঠক ও পরিকল্পনার কাজে ব্যবহার করতেন।

সেবাইতদের প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, মন্দিরের সঙ্গে গোপন সুড়ঙ্গপথের কাহিনিও জড়িয়ে রয়েছে। সেই পথ ধরে বিপ্লবীরা এখানে এসে দেবীর পুজো দিতেন এবং দেশের স্বাধীনতার পরিকল্পনা করতেন বলে লোকমুখে প্রচলিত। মন্দিরের পিছনে ছিল বড় জলাশয় এবং সারি সারি বট ও অশ্বত্থ গাছ। ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই পরিবেশ আত্মগোপনের জন্য উপযুক্ত ছিল বলে মনে করা হয়।

তবে এই সমস্ত কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রামাণ্য নথি ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবুও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই জনশ্রুতি মন্দিরটির প্রতি মানুষের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বন্দেমাতরম মন্ত্রে মা কালীর আরাধনা

এই মন্দিরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো পুজোর রীতি। সেবাইতদের দাবি, এখানে দিনে-রাতে এবং অমাবস্যার বিশেষ তিথিতেও বন্দেমাতরম মন্ত্র উচ্চারণ করে মা কালীর নিত্যপুজো করা হয়। দেবীকে ভারত মাতা রূপে কল্পনা করে আরাধনা করেন ভক্তরা। ফলে ধর্মীয় আচার এবং দেশাত্মবোধের এক বিশেষ আবহ তৈরি হয় মন্দির চত্বরে।

আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখানে কালীপুজোর মূল আয়োজন শুরু হয় কালীপুজোর দিন নয়, ভূত চতুর্দশীর রাতেই। সেই বিশেষ রাতে মন্দিরে ভক্তদের সমাগম হয়। দুর্গাপুরের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা এবং ভিন রাজ্য থেকেও বহু মানুষ এই মন্দিরে আসেন বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁদের কাছে এই মন্দির শুধু দেবী দর্শনের স্থান নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও একটি বিশেষ ঠিকানা।

ঐতিহ্য রয়েছে, কিন্তু সংস্কারের দাবি সেবাইতদের

মন্দিরের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আগ্রহ থাকলেও, মন্দিরের বর্তমান অবস্থা এবং উন্নয়ন নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে মন্দির কমিটির। তাঁদের বক্তব্য, দেশজুড়ে বন্দেমাতরম নিয়ে নানা আলোচনা হলেও দুর্গাপুরের এই ভারত মাতার মন্দির এখনও যথাযথ পরিচিতি ও গুরুত্ব পায়নি।

সেবাইতদের অভিযোগ, এখনও পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় বিধায়ক—কেউই মন্দির পরিদর্শনে আসেননি। মন্দিরের সংস্কার, পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তাঁরা। তাঁদের আশা, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর উদ্যোগী হলে এই প্রাচীন মন্দিরের ইতিহাস আরও বেশি মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

আধুনিক দুর্গাপুরের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও অম্বুজা নগরীর এই মন্দির যেন অতীতের এক নীরব সাক্ষী। লোককথা, স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি, বন্দেমাতরমের আবহ এবং মা কালীর আরাধনা—সব মিলিয়ে মন্দিরটির রয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়। প্রয়োজন শুধু যথাযথ সংরক্ষণ, ঐতিহাসিক তথ্যের অনুসন্ধান এবং বৃহত্তর মানুষের কাছে এই ঐতিহ্যকে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ।