Home ফ্যাক্ট ফাইল পঞ্চায়েতের পাঁচ কাহন পৌর বার্তা জেলার চালচিত্র চাষী ভাই বলছি শরীর স্বাস্থ্য জেলার সেনাপতি মাঠে ময়দানে বিনোদন সম্পাদকীয় কলম
BREAKING NEWS
বহরমপুরের ভাকুড়ির বকুলতলায় প্রাচীন মায়ের মন্দিরে ভক্তদের ঢল, উলুধ্বনি ও ঢাকের আওয়াজে মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণ   •   বস্ত্র বিতরণ, নাকি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের হাতিয়ার? মানবিকতার আসল পরিচয় কি ছবির ফ্রেমে, নাকি নিঃস্বার্থ সাহায্যে?   •   আল্পনা ডিঙিয়ে ফ্ল্যাটে চুরি! হলুদ গ্লাভস, মুখ ঢাকা, হাতে কাস্তে-লোহার রড নিয়ে চার দুষ্কৃতী, সিসিটিভি দেখে হতবাক দুর্গাপুর   •   দূষণে শ্বাসরুদ্ধ কলকাতা! শহর কি ফের পরিণত হচ্ছে ‘যক্ষ্মা নগরী’তে? বায়ুদূষণ নিয়ে সরব অধীর রঞ্জন চৌধুরী   •   গড়িয়ায় লিভ-ইন পার্টনারকে কুপিয়ে খুন! গ্রেফতার তরুণী ও তাঁর মা, চাঞ্চল্য ফর্তাবাদে   •   মন্দিরবাজারে ‘নবকালী’ থিমে নজরকাড়া শ্যামাপুজো, স্বামীজি সংঘের উদ্যোগে দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ

চিনির দাম বাড়লেও ঐতিহ্যে ভাটা নেই, মানকরের কদমা তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পীরা

08 Nov 2026
04:59 AM


নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: কালীপুজো মানেই বাংলার নানা প্রান্তে নানা রকম ঐতিহ্য ও রীতি। তবে পূর্ব বর্ধমানের মানকর গ্রামের কালীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বিশেষ মিষ্টির নাম—কদমা। দেবী কালীর পুজোয় কদমা নিবেদন করার রীতি এখানে বহুদিনের। সময় বদলেছে, বেড়েছে চিনির দাম, কিন্তু বদলায়নি মানকরের এই প্রাচীন ঐতিহ্য। আর সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই কালীপুজোর আগে কদমা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এলাকার শিল্পীরা।

অন্যান্য এলাকার মতো মানকর গ্রামেও মহাসমারোহে পালিত হয় কালীপুজো। তবে এখানকার পুজোর অন্যতম আকর্ষণ কদমা। স্থানীয়দের কাছে কালীপুজো এবং কদমা যেন একে অপরের পরিপূরক। ছোট-বড় প্রতিটি পুজোতেই দেবীর উদ্দেশে কদমা নিবেদন করা হয়। তাই পুজোর মরশুম এলেই কদমার চাহিদা বেড়ে যায়।

ডাকাতদের পুজো থেকে লোকঐতিহ্যের অংশ

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় মানকর ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা। সেই জঙ্গলে ডাকাতদের আস্তানা ছিল বলে কথিত রয়েছে। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে তারা মা কালীর পুজো করতেন। ফলমূলের পাশাপাশি দেবীর কাছে নিবেদন করা হতো কদমা। ধীরে ধীরে সেই রীতি এলাকার মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। কালীপুজোর সঙ্গে কদমা নিবেদনের প্রথা মানকরের নিজস্ব পরিচিতি হয়ে ওঠে।

এই ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেই স্থানীয় মিষ্টি প্রস্তুতকারীরা বিশেষ পদ্ধতিতে কদমা তৈরি শুরু করেন। চিনি ফুটিয়ে তার সঙ্গে ছানার জল মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই মিষ্টি। কোনও রাসায়নিক ব্যবহার না করে পুরনো পদ্ধতি মেনে কদমা তৈরির দাবি শিল্পীদের। মানকরের কদমার বিশেষত্ব হলো, এটি বাইরে থেকে গোলাকার হলেও ভিতরে থাকে ফাঁপা।

১৩৮টি কালীপুজো, কদমার চাহিদা তুঙ্গে

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, মানকর গ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩৮টি কালীপুজোর আয়োজন হয়। প্রতিটি পুজোতেই কদমা নিবেদনের রীতি থাকায় কালীপুজোর আগে থেকেই বরাত পেতে শুরু করেন স্থানীয় শিল্পীরা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিভিন্ন মাপের কদমা তৈরির কাজ চলছে জোরকদমে।

হাটতলার প্রবীণ কদমা শিল্পী হারাধন কর জানিয়েছেন, প্রায় ৬০ বছর ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বাবা এই কাজ করতেন। বাবার কাছ থেকেই তিনি কদমা তৈরির পদ্ধতি শিখেছেন। তাঁর কথায়, মানকরের কদমা তৈরির পদ্ধতি অন্য জায়গার থেকে আলাদা। বাজারের অনেক কদমা সাদা করার জন্য রাসায়নিক ব্যবহার করা হলেও মানকরে এখনও পুরনো পদ্ধতিতেই কদমা তৈরি করা হয়।

একসময় মানকরের কদমা শুধু পূর্ব বর্ধমানেই নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এমনকি ভিনরাজ্যেও এই কদমা পাঠানো হয়। শিল্পীদের দাবি, একসময় বিদেশেও মানকরের কদমা রপ্তানি হতো। ফলে এই মিষ্টি শুধু পুজোর প্রসাদ নয়, মানকরের ঐতিহ্য ও পরিচিতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

চিনির দাম বৃদ্ধিতে চিন্তায় শিল্পীরা

তবে ঐতিহ্য বজায় রাখার পথে এবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিনির দাম বৃদ্ধি। কদমা তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ চিনি। ফলে চিনির দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। অন্যদিকে বেশি দামে কদমা কিনতে অনীহা দেখাচ্ছেন অনেক ক্রেতা। দাম শুনে কেউ কেউ পিছিয়েও যাচ্ছেন। এতে লাভের অঙ্ক কমে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন শিল্পীরা।

তবুও কালীপুজোর ঐতিহ্য রক্ষায় কাজ বন্ধ রাখেননি তাঁরা। বরাত অনুযায়ী কদমা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ তাঁদের কাছে এটি শুধুমাত্র ব্যবসা নয়, বংশপরম্পরায় চলে আসা শিল্প এবং এলাকার সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগ।

স্থানীয় বাসিন্দা জয় গোপাল দে বলেন, “মানকরের কদমা আমাদের গর্ব। বর্ধমানের মিহিদানা-সীতাভোগের মতোই মানকরের কদমা বিখ্যাত।” তাঁর মতে, এই কদমার সঙ্গে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে হাটতলার ব্যবসায়ী কার্তিক দে জানিয়েছেন, এবার ১৫ থেকে ১৮ কেজি ওজনের বড় কদমা তৈরির বরাতও পেয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ছোট আকারের কদমা প্রসাদ হিসেবেও দেওয়া হয়। তাঁর কথায়, চিনির দাম যতই বাড়ুক, মানকরে কালীপুজোয় কদমা তৈরি হবেই।

 বাজারদরের চাপ এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মতো নানা সমস্যার মধ্যেও মানকরের কদমা শিল্পীরা তাঁদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই মিষ্টি তৈরির শিল্প আজও কালীপুজোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই মানকরের কালীপুজোয় দেবীর আরাধনার পাশাপাশি কদমার গন্ধ ও স্বাদেও মিশে থাকে গ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের আবেগ।