নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হল এক অভিনব ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। নদীমাতৃক সুন্দরবনে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার কথা অনেকেই শুনেছেন। বর্ষার মরশুমে কিংবা বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে নদীতে নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন দেখা যায়। কিন্তু এবার নৌকার বদলে কলার ভেলা নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে সকলের নজর কাড়ল বাসন্তী বিধানসভার হিরন্ময়পুর। নারায়ণতলী একাদশ সংঘের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত এই কলার ভেলা দৌড় প্রতিযোগিতাকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। বিশেষ করে কচিকাঁচাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
সুন্দরবনের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নদী ও জলপথের সম্পর্ক বহুদিনের। এখানকার মানুষের কাছে নদী শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, জীবিকা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নৌকা, মাছ ধরা এবং বিভিন্ন ধরনের জলক্রীড়া। সেই ঐতিহ্যেরই একটি বিশেষ দিককে সামনে নিয়ে আসতে হিরন্ময়পুরে এই ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
নৌকাবাইচের আদলে কলার ভেলার দৌড়
সাধারণত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় একাধিক নৌকা নদীর বুকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে। কিন্তু হিরন্ময়পুরের এই প্রতিযোগিতায় নৌকার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় কলার ভেলা। কলাগাছ দিয়ে তৈরি ভেলা নিয়ে জলপথে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন প্রতিযোগীরা। এই অভিনব আয়োজন দেখতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বহু কচিকাঁচা ও উৎসুক দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।
কলার ভেলা সুন্দরবনের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। অতীতে বিভিন্ন প্রয়োজনে গ্রামাঞ্চলে কলাগাছের ভেলা ব্যবহার করা হতো। সেই পুরনো জীবনযাত্রার স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই এমন আয়োজন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
গ্রামীণ সংস্কৃতি ও হারিয়ে যাওয়া খেলাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ
বর্তমান সময়ে আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে বহু গ্রামীণ খেলাধুলা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের কারণে নতুন প্রজন্মের অনেকেই গ্রামবাংলার পুরনো খেলাধুলা সম্পর্কে খুব বেশি জানার সুযোগ পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে নারায়ণতলী একাদশ সংঘের উদ্যোগে কলার ভেলা প্রতিযোগিতার আয়োজন স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
এই ধরনের প্রতিযোগিতা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করারও একটি সুযোগ। গ্রামের বিভিন্ন বয়সের মানুষ এক জায়গায় মিলিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করেন। বিশেষ করে শিশুদের কাছে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
প্রতিযোগিতা নিয়ে কী বললেন প্রদীপ সরদার?
এই আয়োজনের প্রসঙ্গে কথা বলা হয় বাসন্তী বিধানসভায় বিজেপির কো-অর্ডিনেটর প্রদীপ সরদারের সঙ্গে। তিনি সুন্দরবনের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং গ্রামীণ খেলাধুলার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
প্রদীপ সরদারের বক্তব্য, সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত নয়, এখানকার নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং গ্রামীণ খেলাধুলারও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমান সময়ে যখন বহু গ্রামীণ খেলা হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই ধরনের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি আয়োজক সংস্থার সকল সদস্য, প্রতিযোগী এবং উপস্থিত এলাকাবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
সুন্দরবনের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার বার্তা
কলার ভেলা প্রতিযোগিতা মূলত সুন্দরবনের মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। তাই এই ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে শুধু একটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় না, বরং পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যায় গ্রামবাংলার পুরনো জীবনযাত্রার নানা স্মৃতি।
বাসন্তীর হিরন্ময়পুরে নারায়ণতলী একাদশ সংঘের এই কলার ভেলা দৌড় প্রতিযোগিতা হয়ে উঠল গ্রামীণ ঐতিহ্য ও আনন্দের এক বিশেষ মিলনমেলা। নৌকার পরিবর্তে কলার ভেলা নিয়ে জলপথে প্রতিযোগিতা, কচিকাঁচাদের উৎসাহ এবং স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি—সব মিলিয়ে এই আয়োজন সুন্দরবনের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আরও একবার সামনে নিয়ে এল। আগামী দিনেও এমন উদ্যোগের মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ খেলাধুলা ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের মধ্যে বেঁচে থাকবে, এমনটাই আশা স্থানীয়দের।