সম্পাদকের কলমে: উৎসবের মরশুমে আলোকসজ্জায় সেজে উঠছে বাংলা। ঘরে ঘরে প্রস্তুতি, পাড়ায় পাড়ায় সাজসজ্জা এবং আতশবাজির আলোয় উৎসবকে বর্ণময় করে তোলার পরিকল্পনা চলছে। তবে উৎসবের আনন্দের মাঝেই বড় প্রশ্ন—বাজি থেকে কোনও দুর্ঘটনা ঘটবে না তো? অতীতের একাধিক দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে এবারও বাজি উৎপাদন, মজুত ও বিক্রির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে।
শব্দবাজির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও তুলনামূলক নিরাপদ আতশবাজি ব্যবহারের উপর জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে এ বছর বাজি সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকা, বিধিনিষেধ এবং নজরদারির বিস্তারিত বিষয় নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলন বা পূর্ণাঙ্গ সরকারি ঘোষণা সামনে আসেনি বলে জানা যাচ্ছে। ফলে প্রশাসনের তরফে কী কী নির্দিষ্ট নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে, তা নিয়ে স্পষ্ট তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন বাজি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় বাজি উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজর রাখার কথা উঠে এসেছে। লুঙ্গি থেকে বজবজ, পাশাপাশি বারুইপুরের চম্পাহাটি ও হারাল—এই এলাকাগুলির বাজি কারখানা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক পরিকাঠামোর উপর পুলিশ প্রশাসনের নজরদারির গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে বাজি তৈরির সময় নিরাপত্তাবিধি মানা হচ্ছে কি না, কোথাও বেআইনিভাবে বাজি মজুত করা হচ্ছে কি না এবং কারখানাগুলিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
চম্পাহাটি ও হারাল দীর্ঘদিন ধরেই বাজি উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এলাকার পরিচিত নাম। বহু মানুষের জীবিকা এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল। তাই একদিকে যেমন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে তাঁদের নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবন-সম্পত্তি রক্ষার প্রশ্নও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নিয়ম মেনে উৎপাদন, নিরাপদ মজুত এবং অনুমোদিত পদ্ধতিতে বাজি বিক্রি নিশ্চিত করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রশাসনের নজরদারির পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নিষিদ্ধ শব্দবাজি ব্যবহার না করা, শিশুদের হাতে বাজি না দেওয়া, দাহ্য পদার্থের কাছাকাছি বাজি না ফাটানো এবং আগুন নেভানোর প্রাথমিক ব্যবস্থা রাখা—এই সতর্কতাগুলি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বেআইনি বাজি তৈরি বা মজুতের খবর পেলে প্রশাসনকে জানানোও নাগরিকদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
এবার উৎসবের আগে নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—আর কোনও বড় দুর্ঘটনা নয়। শুধু নজরদারির ঘোষণা নয়, বাস্তবে কারখানাগুলিতে নিয়মিত পরিদর্শন, নিরাপত্তা বিধির প্রয়োগ এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। বাজি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকা রক্ষা করেই নিরাপদ উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে।
উৎসবের আলো যেন কোনও পরিবারের জীবনে অন্ধকার ডেকে না আনে। আতশবাজির ঝলকানি থাকুক, কিন্তু তার সঙ্গে থাকুক নিরাপত্তা ও সচেতনতা। আনন্দের উৎসব শেষ পর্যন্ত আনন্দেরই থাকুক—দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ গোটা বাংলার মানুষের প্রত্যাশা সেটাই।