নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: পেঁয়াজ ও রসুন চাষিদের জন্য বড় সুযোগ নিয়ে এল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যানপালন দফতর। ফসল তোলার পর কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া কিংবা সংরক্ষণের অভাবে পেঁয়াজ-রসুন নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যা কমাতে স্বল্প খরচে সংরক্ষণাগার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মিশন ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অফ হর্টিকালচার (MIDH) প্রকল্পের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের অধীনে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রকল্পে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণাগার নির্মাণের জন্য মোট প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সরকারি ভর্তুকি পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ প্রকল্পের বাকি ৫০ শতাংশ, প্রায় ১ লক্ষ টাকা, বহন করতে হবে উপভোক্তাকে। তবে ভর্তুকি পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম, যাচাই এবং নির্মাণ-পরবর্তী শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক।
উদ্যানপালন দফতরের প্রকাশিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত কৃষকরাই নন, কৃষকদের বিভিন্ন সংগঠনও এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আবেদন করতে পারবেন—
ব্যক্তিগত কৃষক
Farmers’ Interest Group (FIG)
Farmers Producer Organisation (FPO)
Farmers Producer Company (FPC)
Commodity Interest Group (CIG)
স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা SHG
উদ্যানপালন-সংক্রান্ত উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা
অর্থাৎ পেঁয়াজ ও রসুন উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং সংগঠনগুলির জন্য এই প্রকল্পে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যানপালন দফতরের নির্ধারিত পোর্টাল wbfpih.wb.gov.in-এর মাধ্যমে আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
অনলাইনে আবেদন করার পর তার প্রিন্ট কপি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলার উদ্যানপালন দফতর অথবা মহকুমা উদ্যানপালন দফতরে জমা দিতে হবে।
আবেদনের সময় সাধারণত যে নথিগুলি প্রয়োজন হবে, সেগুলি হল—
১. জমির দলিল, রেকর্ড অব রাইটস (ROR) অথবা খাজনার রসিদ।
২. আবেদনকারীর আধার কার্ড।
৩. ভোটার কার্ড।
৪. সক্রিয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য এবং পাসবইয়ের প্রথম পাতার কপি।
৫. বৈধ মোবাইল নম্বর।
৬. সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
৭. কৃষক হলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কৃষক বন্ধু আইডি।
আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট পোর্টালে নথিপত্রের সম্পূর্ণ তালিকা এবং শর্তাবলি দেখে নেওয়া জরুরি।
এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। আবেদন করলেই যে প্রত্যেককে সংরক্ষণাগার তৈরির অনুমতি বা ভর্তুকি দেওয়া হবে, এমন নয়। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, আবেদনকারীর সংখ্যা বরাদ্দকৃত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি হলে প্রাথমিক যাচাইয়ের পর লটারির মাধ্যমে উপভোক্তা নির্বাচন করা হতে পারে। নির্বাচিত আবেদনকারীদের কাজের আদেশ দেওয়া হবে।
সংরক্ষণাগার নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর নির্দিষ্ট নিয়মে তা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের Krishi Mapper অ্যাপে সংরক্ষণাগারটির জিও-ট্যাগিং করাও বাধ্যতামূলক। এই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও যাচাইয়ের পরেই অনুমোদিত ভর্তুকির টাকা দেওয়া হবে। তাই নির্মাণের আগে বা শুধু আবেদন জমা দেওয়ার ভিত্তিতে ভর্তুকির টাকা পাওয়া যাবে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পেঁয়াজ ও রসুন এমন ফসল, যেগুলি সঠিক পরিবেশে সংরক্ষণ না করলে দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে পেঁয়াজ তোলার মরশুমে বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ফসল চলে আসে। ফলে অনেক সময় চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি হওয়ায় দাম কমে যায়। সেই সময় কৃষকরা লোকসানের আশঙ্কায় কম দামেই ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন।
অন্যদিকে, কয়েক মাস পর বাজারে পেঁয়াজের জোগান কমে গেলে দাম বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় সেই সময়ের জন্য ফসল ধরে রাখতে পারেন না বহু কৃষক। ফলে উৎপাদনের পরিশ্রম করেও বাজারের ওঠানামার কারণে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্বল্প খরচের এই সংরক্ষণাগার তৈরি হলে কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত পেঁয়াজ ও রসুনের একটি অংশ কিছু সময়ের জন্য মজুত রাখতে পারবেন। এতে ফসল তোলার সঙ্গে সঙ্গেই বাধ্য হয়ে বিক্রি করার চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে সংরক্ষণের সময়কাল ও ফসলের গুণমান নির্ভর করবে নির্মাণের মান, বায়ু চলাচল, আর্দ্রতা এবং সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতির উপর।
কৃষকদের কাছে উৎপাদন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ ফসলের সঠিক বিপণন ও সংরক্ষণ। বাজারে দাম কম থাকলে ফসল ধরে রাখার সুযোগ থাকলে কৃষকরা তুলনামূলক ভালো দামের সময় বিক্রির পরিকল্পনা করতে পারেন। এতে আয়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। পাশাপাশি ফসল নষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমানো গেলে কৃষকের আর্থিক ক্ষতিও কিছুটা কমবে।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় পেঁয়াজ ও রসুনের চাষ বেশি হয়, সেখানে এই ধরনের ছোট সংরক্ষণাগার কৃষকদের কাজে আসতে পারে। তবে প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে কতজন কৃষক বাস্তবে সুবিধা পাচ্ছেন, কতগুলি সংরক্ষণাগার তৈরি হচ্ছে এবং সেগুলি নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—তার উপর।
এই প্রকল্পের আওতায় ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার সংরক্ষণাগার নির্মাণের জন্য মোট প্রকল্প ব্যয় ২ লক্ষ টাকা ধরা হয়েছে। সর্বোচ্চ সরকারি ভর্তুকি ১ লক্ষ টাকা। তবে প্রকল্পের অনুমোদন, উপভোক্তা নির্বাচন, নির্মাণের নির্ধারিত নকশা এবং জিও-ট্যাগিং-সহ সমস্ত শর্ত পূরণ করতে হবে।
আবেদনের সময়সীমা, জেলার বরাদ্দ এবং বর্তমান আবেদন গ্রহণের অবস্থা জানতে সরকারি পোর্টাল অথবা নিজের জেলার উদ্যানপালন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। কারণ আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা ও বরাদ্দ জেলা অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, পেঁয়াজ ও রসুন চাষিদের জন্য এই প্রকল্প সংরক্ষণের পরিকাঠামো গড়ে তোলার একটি সুযোগ। সরকারি সহায়তা কাজে লাগিয়ে কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে সংরক্ষণাগার তৈরি করতে পারলে ফসলের অপচয় কমানো এবং উপযুক্ত সময়ে বাজারে বিক্রির সুযোগ তৈরি হতে পারে।