নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: খনি ও শিল্প প্রকল্পের নামে পাহাড়, বনাঞ্চল ও জলসম্পদ ধ্বংসের অভিযোগ। আদিবাসী ও বনবাসী মানুষের উচ্ছেদ, নির্যাতন এবং প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদে একাধিক দাবিতে সরব হলেন আন্দোলনকারীরা।আদিবাসী মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং জল-জঙ্গল-জমি রক্ষার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠল পুরুলিয়ার মানবাজার। মানবাজারের পাথরকাটা ফুটবল ময়দানে আয়োজিত হল আদিবাসীদের এক বিশাল মহাসমাবেশ। এই সমাবেশ থেকে খনি, বাঁধ এবং বিভিন্ন শিল্প প্রকল্পের নামে আদিবাসী ও বনবাসী মানুষের জমি, বসতি, বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ তুলে সরব হন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস করে এবং স্থানীয় মানুষের মতামত উপেক্ষা করে কোনও প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়া চলবে না।
‘প্রকৃতির আদিবাসী মঞ্চ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশে উঠে আসে আদিবাসী ও বনবাসী মানুষের দীর্ঘদিনের অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, খনিজ উত্তোলন ও শিল্পায়নের নামে একের পর এক পাহাড়, বনভূমি এবং জলসম্পদের উপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় আদিবাসী পরিবারগুলির জীবনযাত্রা, জীবিকা এবং সংস্কৃতির উপর। প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে তাঁদের জীবন ও অস্তিত্ব গভীরভাবে জড়িত। তাই জল, জঙ্গল ও জমি রক্ষার লড়াই আসলে তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
সমাবেশ থেকে কাশিপুর, ১২ মাইল, মানবাজার, পাঁচপাহাড়ি এবং বেলপাহাড়ি-সহ বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষার দাবি তোলা হয়। বিশেষ করে বিয়ার আর্থ খনিজ উত্তোলনের প্রসঙ্গ তুলে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, খনিজ সম্পদের মুনাফার জন্য বন-পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না। তাঁদের দাবি, খনিজ উত্তোলনের নামে পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল নষ্ট করা এবং জলসম্পদের ক্ষতি বন্ধ করতে হবে। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় স্থানীয় মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।
মহাসমাবেশে আদিবাসী মানুষের উপর অত্যাচার, হয়রানি এবং প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর দমনের অভিযোগও বিশেষভাবে উঠে আসে। আন্দোলনকারীদের দাবি, খনি ও শিল্প প্রকল্পের বিরুদ্ধে কিংবা নিজেদের জমি ও বনভূমির অধিকার রক্ষায় যাঁরা প্রতিবাদ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দায়ের করা হচ্ছে। কোথাও অন্যায়ভাবে আটক, কোথাও হয়রানিমূলক মামলা—এমন অভিযোগ তুলে তাঁরা বলেন, আইনি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে মানুষের ন্যায্য আন্দোলন বন্ধ করা যায় না।
এনসিআরবি-র ২০২৩ সালের তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে সমাবেশে দাবি করা হয়, আদিবাসী মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ৯৩ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয় না। এই পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে আন্দোলনকারীরা বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা এবং মামলার চাপে সাধারণ আদিবাসী পরিবারের দুর্ভোগের বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁদের দাবি, আদিবাসী ও বনবাসী মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে অন্যায়ভাবে আটক ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক দেশে নিজের জমি, বন, পরিবেশ এবং জীবিকার অধিকার রক্ষার দাবিতে প্রতিবাদ করা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে দেখানো উচিত নয়। কোনও প্রকল্পের বিরোধিতা করলেই সংশ্লিষ্ট মানুষকে মামলার মুখে পড়তে হবে, এমন পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তাঁরা দাবি করেন।
সমাবেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল গ্রামবাসীদের সম্মতি ও মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, যে কোনও খনি বা শিল্প প্রকল্পের পরিকল্পনা করার আগে সংশ্লিষ্ট গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তাঁদের মতামত, সম্মতি, জীবন-জীবিকা এবং পরিবেশের উপর প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা না করে কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। উন্নয়নের নামে স্থানীয় মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে তা প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না।
বিশেষ করে আদিবাসী সমাজের কাছে বন ও পাহাড় শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাদ্যাভ্যাস, জীবিকা এবং সামাজিক পরিচয়। বনাঞ্চল ধ্বংস হলে শুধু গাছপালা বা বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হয় না, বিপন্ন হয়ে পড়ে বহু পরিবারের দৈনন্দিন জীবন। একইভাবে পাহাড় ও জলসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষিকাজ, পানীয় জলের জোগান এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
তাই মহাসমাবেশ থেকে দাবি ওঠে, প্রকৃতির সম্পদের উপর আদিবাসী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বন-পাহাড় ও জলসম্পদ রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমিকা স্বীকার করতে হবে। তাঁদের জীবন-জীবিকা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয়।
সমাবেশের মূল স্লোগান ও বক্তব্যে বারবার উঠে আসে—‘জল, জঙ্গল, জমি মুনাফার জন্য লুট হতে দেব না’। আন্দোলনকারীদের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ কেবল মুনাফা অর্জনের উপকরণ নয়। এগুলি স্থানীয় মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই খনিজ উত্তোলনের নামে বন-পাহাড় ধ্বংস বন্ধ করা এবং আদিবাসী ও বনবাসী মানুষের অধিকার সুরক্ষিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে মানবাজারের পাথরকাটা ফুটবল ময়দানের এই মহাসমাবেশ আদিবাসী অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ন্যায়বিচারের দাবিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। আন্দোলনকারীদের বার্তা, উন্নয়নের বিরোধিতা নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের অধিকারকে মর্যাদা দিয়েই উন্নয়নের পথ নির্ধারণ করতে হবে। জল-জঙ্গল-জমি রক্ষা, হয়রানিমূলক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আদিবাসী মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে তাঁদের আন্দোলন আগামী দিনেও জারি থাকবে।
আদিবাসী ও বনবাসী মানুষের দাবি একটাই—প্রকৃতি বাঁচুক, মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকুক, জল-জঙ্গল-জমির উপর স্থানীয় মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক।