নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: কালীপুজো ও দীপাবলির আগে নিষিদ্ধ শব্দবাজির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিল বারুইপুর পুলিশ জেলা। উৎসবের মরসুমে বাজির বাজারে যখন কেনাবেচার ব্যস্ততা তুঙ্গে, ঠিক সেই সময় চম্পাহাটির ঐতিহ্যবাহী হারাল বাজি বাজারে যৌথ মেগা অভিযান চালাল পুলিশ। মঙ্গলবারের এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ শব্দবাজি, বিশেষ করে চকলেট বোম-সহ বিভিন্ন ধরনের বেআইনি বাজি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে বাজি বিক্রির অভিযোগে পাঁচটি দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওই পাঁচ দোকান মালিকের বিরুদ্ধে আইনি মামলা রুজু করা হয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
উৎসবের আনন্দের আড়ালে যাতে নিষিদ্ধ শব্দবাজির দাপট না বাড়ে, সেই লক্ষ্যেই এই অভিযান বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। পুলিশের এই পদক্ষেপে একদিকে যেমন বেআইনি বাজি ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে, অন্যদিকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বাজি বিক্রির বিষয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা পৌঁছে গিয়েছে ব্যবসায়ী মহলে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটি দীর্ঘদিন ধরেই বাজি তৈরির ও বিক্রির অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র। কালীপুজো এবং দীপাবলিকে সামনে রেখে প্রতি বছরই এই এলাকায় বাজির ব্যবসা জমে ওঠে। দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা এখানে আসেন। স্বাভাবিকভাবেই উৎসবের মরসুমে বাজারে ভিড় ও কেনাবেচা বেড়ে যায়।
তবে বাজির ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিরাপত্তা ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনুমোদিত পরিবেশবান্ধব বাজির পাশাপাশি কোথাও নিষিদ্ধ শব্দবাজি বিক্রি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি থাকে। সেই নজরদারির অংশ হিসেবেই মঙ্গলবার হারাল বাজি বাজারে যৌথ অভিযান চালানো হয়।
বারুইপুর পুলিশ জেলা ও বারুইপুর থানার উদ্যোগে পরিচালিত এই অভিযানে বাজারের একাধিক দোকানে তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশির সময় নিষিদ্ধ চকলেট বোম-সহ বিভিন্ন ধরনের বেআইনি শব্দবাজি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে অবৈধভাবে বাজি বিক্রির অভিযোগে পাঁচটি দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই বিশেষ অভিযানে নেতৃত্ব দেন বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাস। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বারুইপুরের এসডিপিও, বারুইপুর থানার আইসি এবং বিশাল পুলিশ বাহিনী।
পুলিশ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে বাজারের বিভিন্ন দোকানে তল্লাশি চালানো হয়। কোন দোকানে কী ধরনের বাজি বিক্রি হচ্ছে, সেগুলি সরকারি বিধি মেনে তৈরি ও বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়। বিশেষ করে নিষিদ্ধ শব্দবাজি এবং পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর বাজির সন্ধানে নজরদারি চালানো হয়।
অভিযান চলাকালীন বেশ কিছু দোকান থেকে নিষিদ্ধ বাজি উদ্ধার হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দোকানগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাঁচটি দোকান বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হওয়া বাজির মধ্যে নিষিদ্ধ চকলেট বোম-সহ বিভিন্ন ধরনের শব্দবাজি রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। উচ্চ শব্দ তৈরি করা এই ধরনের বাজি সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি এবং অসুস্থ মানুষের জন্যও সমস্যার কারণ হতে পারে। শব্দদূষণের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিতভাবে তৈরি বা সংরক্ষণ করা বাজি থেকে অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজি তৈরির সময় নিরাপত্তাবিধি মানা না হলে এবং দোকানে যথাযথ সতর্কতা ছাড়া বিস্ফোরকজাতীয় সামগ্রী মজুত করা হলে বড়সড় বিপদ ঘটতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বাজার এলাকায় এই ধরনের ঝুঁকি আরও বেশি।
এই কারণেই উৎসবের আগে নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি বন্ধ করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, উৎসবের আনন্দ বজায় রাখতে হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং পরিবেশের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
অভিযান শেষে বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাস বেআইনি বাজি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে। লাগাতার সচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় লুকিয়ে নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি করছেন।
তিনি সতর্ক করে জানান, এই ধরনের বেআইনি শব্দবাজি বা বাজি থেকে যে কোনও সময় বড়সড় অগ্নিকাণ্ড কিংবা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কোনওভাবেই নিষিদ্ধ বাজি বিক্রির বিষয়টি বরদাস্ত করা হবে না।
পাশাপাশি তিনি সাধারণ বাজি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশেও আবেদন জানান। যাঁদের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা যেন সরকারি নিয়ম মেনে এবং অনুমোদিত পরিবেশবান্ধব বাজির ব্যবসা করেন। প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করে নিরাপদ ব্যবসার পরিবেশ বজায় রাখারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, মঙ্গলবারের অভিযানের পরেও যদি চম্পাহাটি কিংবা আশপাশের এলাকায় গোপনে নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি চলতে থাকে, তাহলে আরও কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। বেআইনি ব্যবসার বিরুদ্ধে কোনও রকম আপস করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে প্রয়োজনে গোটা হারাল বাজি বাজার বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। এই বার্তায় ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, হারাল বাজারের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। তাই কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে যাতে গোটা বাজারের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই বিষয়টিও সামনে এসেছে।
পুলিশের অভিযান শেষ হওয়ার পর স্থানীয় বাজি ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশন বা সমিতিকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, শুধু পুলিশের অভিযান চালিয়ে বেআইনি বাজি বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। বাজারের ভিতর থেকে ব্যবসায়ীদেরও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করতে হবে।
সেই কারণে সমিতিকে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে।
প্রথমত, বাজার চত্বরে নিজেদের উদ্যোগে কড়া নজরদারি চালাতে হবে, যাতে কোনও দোকানে নিষিদ্ধ শব্দবাজি বিক্রি না হয়।
দ্বিতীয়ত, ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষের মধ্যে পরিবেশবান্ধব বাজি কেনাবেচা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোন বাজি অনুমোদিত এবং কোন বাজি নিষিদ্ধ, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, বাজারে কোনও ব্যবসায়ী বেআইনিভাবে নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি করছেন বলে জানা গেলে তাঁকে চিহ্নিত করে প্রশাসনকে জানাতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশকে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে।
পুলিশের মতে, ব্যবসায়ী সমিতি এবং প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগেই বাজারকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।
চম্পাহাটির হারাল বাজি বাজার শুধু একটি কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, এর সঙ্গে বহু ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবারের রুজি-রুটি জড়িয়ে রয়েছে। উৎসবের মরসুমে এই বাজারের ব্যবসা অনেকের কাছে সারা বছরের গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। ফলে নিষিদ্ধ বাজির বিরুদ্ধে প্রশাসনের পদক্ষেপের পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনের বার্তা, বাজির ব্যবসা বন্ধ করাই একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং সরকারি নিয়ম মেনে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বাজির ব্যবসা নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। কোনও ব্যবসায়ী যদি নিয়ম মেনে অনুমোদিত বাজি বিক্রি করেন, তাহলে তাঁর ব্যবসায় বাধা দেওয়ার প্রশ্ন নেই। কিন্তু নিষিদ্ধ শব্দবাজি বিক্রি বা বেআইনি মজুতের অভিযোগ উঠলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উৎসবের মরসুমে শব্দদূষণ ও বাজি থেকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ থাকে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শব্দ বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। পাশাপাশি পোষ্য প্রাণী ও পরিবেশের ওপরও শব্দবাজির বিরূপ প্রভাব পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে হারাল বাজি বাজারে পুলিশের অভিযানে সাধারণ নাগরিক ও পরিবেশ সচেতন মহলের একাংশ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। তাঁদের মতে, উৎসবের আনন্দ যেন অন্যের অসুবিধা বা বিপদের কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মঙ্গলবারের এই অভিযানকে কেবল একটি দিনের পুলিশি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না প্রশাসন। উৎসবের দিনগুলিতেও নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি ও মজুতের বিরুদ্ধে নজরদারি চালানো হতে পারে। তাই হারাল বাজি বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে—সরকারি বিধি মেনে ব্যবসা করতে হবে এবং নিষিদ্ধ শব্দবাজি থেকে দূরে থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে কালীপুজো ও দীপাবলির আগে চম্পাহাটির হারাল বাজি বাজারে বারুইপুর পুলিশ জেলার এই মেগা অভিযান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। পাঁচটি দোকান বন্ধ, বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ শব্দবাজি বাজেয়াপ্ত এবং দোকান মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা—এই তিন পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে, উৎসবের মরসুমে বেআইনি বাজি ব্যবসার বিরুদ্ধে তারা কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত। এখন নজর থাকবে, পুলিশের এই অভিযানের পর বাজারে নিষিদ্ধ শব্দবাজির বিক্রি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ব্যবসায়ী সমিতি প্রশাসনের নির্দেশ মেনে কতটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।