নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: চিকিৎসার আশায় সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে হাজির হলেন এক দম্পতি। প্রায় এক বছর আগে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় কাঁধের হাড় ভেঙেছিল বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের বাসিন্দা নীহার মিস্ত্রীর। একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েও তাঁর কাঁধের সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি বলে দাবি পরিবারের। এখনও মাঝেমধ্যেই অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগতে হয় তাঁকে। শেষ পর্যন্ত ক্যানিংয়ে থাকা এক নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে সেখানকার হাসপাতালের অস্থিরোগ চিকিৎসার কথা জানতে পেরে স্ত্রী চম্পাকে সঙ্গে নিয়ে বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসায় ভারতে আসেন নীহার। বর্তমানে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা এবং অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রতি রোগীদের আস্থার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। শুধু ক্যানিং নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও বহু মানুষ ওই চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা করাতে আসেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।
বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের বাসিন্দা প্রায় ৪৫ বছর বয়সি নীহার মিস্ত্রী পেশায় দিনমজুর। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিশ্রম করে পরিবারের খরচ চালাতেন তিনি। কিন্তু প্রায় এক বছর আগে কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন নীহার। পড়ে যাওয়ার ফলে তাঁর কাঁধের হাড় ভেঙে যায়।
দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের একাধিক সরকারি হাসপাতালে যান তিনি। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করানোর পরও কাঁধের হাড় ঠিকমতো জোড়া লাগেনি বলে তাঁর দাবি। ফলে স্বাভাবিকভাবে হাত নাড়াচাড়া করা এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে সমস্যায় পড়তে থাকেন তিনি। মাঝেমধ্যেই কাঁধে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। দিনমজুরের কাজ করাও তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যায় ভুগতে ভুগতে কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছিলেন নীহার ও তাঁর পরিবার। কারণ, শারীরিক অসুবিধার জন্য নিয়মিত কাজ করতে না পারায় সংসারের আর্থিক অবস্থার উপরেও প্রভাব পড়তে শুরু করে।
এই পরিস্থিতিতে ক্যানিংয়ে বসবাসকারী এক নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালের অস্থিরোগ চিকিৎসার কথা জানতে পারেন নীহার। আত্মীয়ের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে একজন অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়মিত রোগী দেখেন এবং দূরদূরান্ত থেকেও বহু মানুষ তাঁর কাছে চিকিৎসা করাতে আসেন।
সেই খবর পাওয়ার পর আর দেরি করেননি নীহার। প্রয়োজনীয় বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসার ব্যবস্থা করে স্ত্রী চম্পাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে আসেন। এরপর পৌঁছন ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে। সেখানে অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কার্ত্তিক নাসিপুরির কাছে নিজের শারীরিক সমস্যার কথা জানান তিনি।
চিকিৎসক কার্ত্তিক নাসিপুরি নীহারের দুর্ঘটনার বিবরণ শোনেন এবং তাঁর কাঁধের সমস্যা পরীক্ষা করেন। চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় কাঁধের হাড় ভেঙে যাওয়ার পর সেটি সঠিক অবস্থানে না জুড়ে বাঁকা অবস্থায় জোড়া লেগেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রণা ও শারীরিক অসুবিধা তৈরি হয়েছে।
তবে চিকিৎসার মাধ্যমে নীহার সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন বলে তাঁকে আশ্বাস দিয়েছেন চিকিৎসক। ইতিমধ্যেই ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নীহারের মতো একজন রোগী চিকিৎসার আশায় বিদেশ থেকে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে এসেছেন, এই বিষয়টিকে হাসপাতালের চিকিৎসকও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালের অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কার্ত্তিক নাসিপুরি প্রতি মঙ্গলবার আউটডোরে রোগী দেখেন। তাঁর কাছে শুধু ক্যানিং এলাকার রোগীরাই নন, বারুইপুর, ডায়মন্ড হারবার-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ চিকিৎসা করাতে আসেন।
স্থানীয়দের মধ্যে অস্থিরোগ চিকিৎসক হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। ফলে প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার হাসপাতালের আউটডোরে রোগীদের ভিড় দেখা যায়। অনেক সময় অন্যান্য আউটডোর পরিষেবা দুপুর দুটো নাগাদ বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁর কাছে রোগী দেখানোর চাপ থাকায় চিকিৎসা পরিষেবা সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত চলেছে বলেও জানা যায়।
দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের মধ্যে অনেকেই হাড় ভাঙা, জয়েন্টের ব্যথা এবং অন্যান্য অস্থিসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা করাতে আসেন। সেই চিকিৎসকের খোঁজই আত্মীয়ের মাধ্যমে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের নীহার মিস্ত্রী।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কার্ত্তিক নাসিপুরি জানান, বাংলাদেশের মতো একটি প্রতিবেশী দেশ থেকে এতটা পথ পেরিয়ে কেউ ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে এসেছেন, এটি তাঁদের কাছে গর্বের বিষয়। রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম মেনেই পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চিকিৎসকের কথায়, “ভিন দেশ থেকে কেউ এতটা পথ পেরিয়ে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছেন, এটা আমাদের কাছে অনেক গর্বের বিষয়। আমাদের চেষ্টা থাকবে রোগীকে সুস্থ করে তোলা। সমস্ত নিয়ম মেনে আমরা চিকিৎসা শুরু করেছি।”
চিকিৎসকের এই আশ্বাসে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন নীহার ও তাঁর স্ত্রী। দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় এখন চিকিৎসার পরবর্তী ধাপের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তাঁরা।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে নীহার জানান, বাংলাদেশে একাধিক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েও তাঁর কাঁধের সমস্যা পুরোপুরি মেটেনি বলে তিনি মনে করেন। দুর্ঘটনার প্রায় এক বছর পরেও মাঝেমধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম করতে না পারায় জীবনযাপনও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নীহারের কথায়, “বাংলাদেশে একাধিক হাসপাতালে ঘুরেও সঠিক চিকিৎসা পাইনি। এখনও মাঝে মধ্যেই কাঁধে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। আত্মীয়দের কাছ থেকেই জানতে পারি ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে ভালো হাড়ের চিকিৎসা হয়। সেটা জেনেই পাসপোর্ট, ভিসা করে এদেশে এসেছি। ডাক্তারবাবু আশ্বাস দিয়েছেন সুস্থ হয়ে উঠব আমি।”
দীর্ঘদিনের সমস্যার পর নতুন করে চিকিৎসা শুরু হওয়ায় আশার আলো দেখছেন তিনি। এবার সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরতে পারবেন, এমনটাই প্রত্যাশা তাঁর।
নীহারের স্ত্রী চম্পার কাছে স্বামীর সুস্থ হয়ে ওঠা শুধু শারীরিক সমস্যার সমাধান নয়, সংসারের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে। কারণ, পরিবারে নীহারই একমাত্র রোজগেরে। দুর্ঘটনার পর কাঁধের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তিনি আগের মতো দিনমজুরের কাজ করতে পারছেন না। ফলে সংসার চালাতে আর্থিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁদের।
চম্পা জানান, স্বামী দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার কাজে যোগ দিতে পারলে সংসারের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। তাঁর কথায়, “সংসারে উনিই একা রোজগেরে। পড়ে গিয়ে কাঁধের হাড় ভাঙায় আর সেভাবে কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসার চালাতে ভীষণ অসুবিধায় পড়েছি। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাতে আবার কাজে যোগ দিতে পারে, সেই আশা করছি।”
সীমান্তের দুই পারে মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের বহু মিল রয়েছে। আত্মীয়তার সূত্রে এক দেশের মানুষ অন্য দেশের চিকিৎসা পরিষেবা সম্পর্কে খোঁজখবর পান। নীহার মিস্ত্রীর ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে আসার ঘটনাও সেই পরিচিত সামাজিক যোগাযোগের একটি উদাহরণ।
তবে এই ঘটনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে একজন দিনমজুরের সুস্থ হয়ে ওঠার লড়াই। দুর্ঘটনায় ভাঙা কাঁধের হাড় এবং দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা তাঁর কর্মজীবনকে থমকে দিয়েছে। পরিবারের আর্থিক দুশ্চিন্তাও বেড়েছে। সেই পরিস্থিতিতে নতুন করে চিকিৎসা শুরু হওয়ায় আশার আলো দেখছেন নীহার ও তাঁর স্ত্রী।
এখন চিকিৎসকের পরামর্শ ও চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগোবে তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার পথ। নীহার আবার কবে স্বাভাবিকভাবে কাজে ফিরতে পারবেন, তার উত্তর দেবে সময়। আপাতত ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর নতুন আশায় বুক বাঁধছেন বাংলাদেশের এই দম্পতি।