নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: কয়লা উত্তোলনের জন্য খনিতে বিস্ফোরণ, আর সেই বিস্ফোরণের অভিঘাত এসে পড়ছে পাশের জনবসতির ঘরবাড়িতে—এমনই গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়াল পশ্চিম বর্ধমানের সালানপুরের বনজেমারি ওপেন কাস্ট প্রজেক্টে (ওসিপি)। মঙ্গলবার দুপুরে খনিতে ভারী ব্লাস্টিং চলাকালীন ছিটকে আসা একটি বড় পাথর ভেঙে দিল নিউ কলোনির এক বাসিন্দার বাড়ির অ্যাসবেস্টসের ছাদ। পাথরটি ঘরের ভিতরে পড়ে মাথায় আঘাত করে বাড়ির গৃহবধূ সঙ্গীতা দেবীকে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে আসানসোলের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকার বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বনজেমারি ওসিপিতে ভারী বিস্ফোরণের কারণে আশপাশের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও দেওয়ালে ফাটল দেখা দিচ্ছে, কোথাও বাড়ির ছাদ ও অন্যান্য অংশে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বারবার আপত্তি জানিয়েও স্থায়ী সমাধান না মেলায় মঙ্গলবারের দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুর তিনটে নাগাদ গ্রামবাসীরা খনির কয়লা উৎপাদন ও পরিবহণ বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় তিন ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ছ'টায় কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে বিক্ষোভ ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুরে বনজেমারি ওসিপিতে কয়লা উত্তোলনের জন্য ভারী ব্লাস্টিং চলছিল। সেই সময় বিস্ফোরণের অভিঘাতে একটি বড় পাথর ছিটকে নিউ কলোনির বাসিন্দা ত্যাগী পাসওয়ানের বাড়িতে এসে পড়ে। পাথরটি বাড়ির অ্যাসবেস্টসের ছাদ ভেঙে সরাসরি ঘরের ভিতরে আছড়ে পড়ে।
সেই সময় বাড়ির ভিতরে বসেছিলেন ত্যাগী পাসওয়ানের স্ত্রী সঙ্গীতা দেবী। ছাদ ভেঙে পড়া পাথরটি তাঁর মাথায় আঘাত করে। আচমকা এই ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পরিবারে এবং আশপাশের এলাকায়। দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে আসানসোলের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
একটি খনি এলাকার পাশে বসবাস করলেও বাড়ির ভিতরে বসে থাকা মানুষের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে সাধারণ বাসিন্দারা কোথায় নিরাপদ থাকবেন—এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে নিউ কলোনির মানুষের মুখে।
মঙ্গলবারের ঘটনা বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয় বলেই দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের। তাঁদের অভিযোগ, বনজেমারি ওসিপিতে দীর্ঘদিন ধরে ভারী ব্লাস্টিংয়ের জেরে আশপাশের বাড়িঘরে কম্পন অনুভূত হয়। অনেক বাড়ির দেওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
বাসিন্দাদের বক্তব্য, খনি কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার সমস্যার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী, স্থায়ী কোনও সমাধান হয়নি। মঙ্গলবার একটি পাথর সরাসরি বাড়ির ছাদ ভেঙে ঘরে ঢুকে মহিলাকে আহত করার পর তাঁরা আর ঝুঁকি নিতে রাজি নন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিস্ফোরণের আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? জনবসতি থেকে ব্লাস্টিংয়ের দূরত্ব কতটা রাখা হচ্ছে? বিস্ফোরণের অভিঘাতে পাথর ছিটকে যাওয়া ঠেকাতে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের তরফে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সঙ্গীতা দেবীর আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন নিউ কলোনির বাসিন্দারা। দুপুর তিনটে নাগাদ তাঁরা বনজেমারি ওসিপিতে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। শুধু প্রতিবাদ নয়, খনির কয়লা উৎপাদন এবং পরিবহণও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
গ্রামবাসীদের দাবি, জনবসতির পাশে এভাবে ভারী ব্লাস্টিং চলতে পারে না। তাঁদের বসতবাড়ি ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কয়লা উত্তোলন চালানো হলে তাঁরা তা মেনে নেবেন না। বিক্ষোভকারীরা কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি নির্দিষ্ট দাবি জানান।
প্রথমত, আহত সঙ্গীতা দেবীর চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে কর্তৃপক্ষকে। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। পাশাপাশি জনবসতি সংলগ্ন এলাকায় ভারী ব্লাস্টিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবিও তোলেন তাঁরা।
দুপুর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের জেরে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বনজেমারি ওসিপিতে কয়লা উৎপাদন ও পরিবহণ বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গ্রামবাসীদের আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা ছ'টা নাগাদ ওসিপির এজেন্টের আশ্বাসে বিক্ষোভ তুলে নেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, আপাতত সাধারণ ব্লাস্টিং বন্ধ রাখার আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সেই আশ্বাসের পরেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এই আশ্বাসে যে তাঁদের সমস্ত উদ্বেগ দূর হয়নি, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন গ্রামবাসীরা।
তাঁদের বক্তব্য, সাময়িকভাবে ব্লাস্টিং বন্ধ রাখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কয়েক দিন পর আবার আগের মতো বিস্ফোরণ শুরু হলে একই ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাবে। তাই তাঁরা লিখিত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন।
গ্রামবাসীদের দাবি, জনবসতির পাশে ভারী ব্লাস্টিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। যদি খনির কাজের স্বার্থে ওই এলাকায় বিস্ফোরণ চালানো অপরিহার্য হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রয়োজনে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে গোটা গ্রামকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের দাবিও তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে বসবাস করা সম্ভব নয়। কয়লা উত্তোলন চলুক, কিন্তু তার জন্য সাধারণ মানুষের প্রাণ ও সম্পত্তি বিপন্ন হতে পারে না।
এখন প্রশ্ন, কর্তৃপক্ষ কি শুধু সাময়িক আশ্বাসেই থেমে থাকবে, নাকি বাসিন্দাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে স্থায়ী সমাধানের পথে এগোবে? আহত মহিলার চিকিৎসার দায়িত্ব, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আটকানোর ব্যবস্থা—সবকিছু নিয়েই স্পষ্ট সিদ্ধান্ত চান এলাকার মানুষ।
কয়লা শিল্পে উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে কয়লার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেই উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারণে যদি আশপাশের জনবসতির মানুষ নিজেদের বাড়িতেও নিরাপদ বোধ না করেন, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
খনিতে ব্লাস্টিংয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিরাপত্তা বিধি, বিস্ফোরণের মাত্রা, পাথর ছিটকে যাওয়া প্রতিরোধের ব্যবস্থা এবং জনবসতির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গলবারের ঘটনার পর সেই সমস্ত ব্যবস্থার যথাযথ মূল্যায়নের দাবি উঠেছে। পাশাপাশি আশপাশের বাড়িঘরে কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
বনজেমারি ওসিপির মঙ্গলবারের ঘটনা ফের একবার খনি এলাকার জনবসতির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল। একটি পাথর কীভাবে খনির এলাকা পেরিয়ে সরাসরি মানুষের বাড়ির ছাদ ভেঙে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার পর্যালোচনা জরুরি। আহত সঙ্গীতা দেবীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন এলাকার বাসিন্দারা। একই সঙ্গে তাঁরা চাইছেন, ভবিষ্যতে আর কোনও পরিবারকে যেন এমন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে না হয়।
কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে, উৎপাদনের চাকা ঘুরবে—কিন্তু সেই উৎপাদনের মূল্য কি দিতে হবে মানুষের জীবন ও বসতবাড়ির নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে বনজেমারি ওসিপি সংলগ্ন নিউ কলোনি।