নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত আয়োজিত মহামিছিলের মঞ্চ থেকে কংগ্রেস ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে একের পর এক আক্রমণ শানালেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি শ্রী নীতিন নবীন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল দলের আদর্শ, জাতীয়তাবাদ, ভোটার তালিকা, অনুপ্রবেশ এবং দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রসঙ্গ। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি দাবি করেন, ১৪০ কোটি দেশবাসীর বিশ্বাস ও আস্থাই ভারতের প্রকৃত শক্তি।
মিছিলের মঞ্চ থেকে বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশে নীতিন নবীনের বার্তা ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, কিছু মানুষের কাছে ব্যক্তিস্বার্থই সবার আগে, দল দ্বিতীয় এবং দেশ সবার শেষে। এই মানসিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টির সেই সমস্ত কর্মীর, যাঁদের আদর্শ হলো—রাষ্ট্র প্রথম, দল দ্বিতীয় এবং ব্যক্তিস্বার্থ সবার শেষে। তাঁর বক্তব্যে দলের কর্মীদের মধ্যে আদর্শ, শৃঙ্খলা এবং দেশপ্রেমের মানসিকতা আরও দৃঢ় করার আহ্বান উঠে আসে।
এরপরই নির্বাচনী ফলাফল এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধীদের বক্তব্যের সমালোচনা করেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি। তাঁর দাবি, নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ হিসেবে ১৩ কোটি ভোটের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু এই ১৩ কোটি ভোটার কারা, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। নীতিন নবীনের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সংখ্যার মধ্যে ৬ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে স্থানান্তরিত হয়েছে, ৩ কোটি মানুষ মৃত এবং বাকি ৩ কোটি অনুপ্রবেশকারী। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তিনি বিরোধীদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, এই ধরনের ভোটার তালিকার উপর নির্ভর করেই কি তাঁরা নির্বাচনে লড়তে চান?
তবে মঞ্চ থেকে তুলে ধরা এই পরিসংখ্যান ও অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি। ভোটার তালিকা সংক্রান্ত এমন গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও সরকারি নথির ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
নীতিন নবীনের বক্তব্যে জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, ভারতের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে ১৪০ কোটি দেশবাসীর বিশ্বাস, আস্থা ও ঐক্যের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে বিপুল সংখ্যক মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, সেটাই দেশের শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি বলে দাবি করেন তিনি।
ইউরোপ, বাংলাদেশ ও নেপালের অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে নীতিন নবীন বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত শক্তিগুলি যদি কারও হাতিয়ার হয়ে ভারতকে অস্থিতিশীল করার স্বপ্ন দেখে, তবে তারা ভুল করছে। তাঁর বক্তব্য, ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী। ১৪০ কোটি মানুষের ঐক্য, সংবিধানের শক্তি এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কোনও শক্তির নেই।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে নিশানা করেন তিনি। অতীতের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে নীতিন নবীন বলেন, একসময় রাহুল গান্ধী নিজেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা বলেছিলেন রাহুল গান্ধী। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, বাংলার মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দিল্লিতেও রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে বলে কটাক্ষ করেন তিনি।
কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত এই মহামিছিলের মাধ্যমে বিজেপি নেতৃত্ব একাধিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বার্তা তুলে ধরতে চেয়েছে। একদিকে দলের কর্মীদের কাছে রাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান, অন্যদিকে ভোটার তালিকা, অনুপ্রবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিরোধী রাজনীতির সমালোচনা—সব মিলিয়ে নীতিন নবীনের বক্তব্যে ছিল রাজনৈতিক আক্রমণের একাধিক দিক।
সব মিলিয়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ মহামিছিল শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এর মঞ্চ থেকে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি দলের আদর্শ, জাতীয় ঐক্য এবং দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা—ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশ, দলের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্র এবং ১৪০ কোটি মানুষের ঐক্যই ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি।