নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে বিজেপি রাজনৈতিক সভাকে কেন্দ্র করে জমজমাট রাজনৈতিক আবহ তৈরি হল। কলকাতা বিভাগের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভাগীয় কনভেনার দেবাংশু পাণ্ডের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় বিপুল জনসমাগমের কথা তুলে ধরে তাঁকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানানো হয়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে দলের সাংগঠনিক শক্তি, আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি, বিরোধীদের ভূমিকা এবং রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
সভা থেকে দেবাংশু পাণ্ডের সাংগঠনিক তৎপরতার প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জেলার দলীয় সভাপতি এবং ডায়মন্ড হারবারের সাংগঠনিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও অভিনন্দন জানানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি। বারুইপুরে এই ধরনের একটি রাজনৈতিক সভা করার পিছনে তাঁর বিশেষ উদ্দেশ্যের কথাও তুলে ধরেন।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, বারুইপুর এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধীদের তৎপরতা বেড়েছে। বিশেষ করে আরশোলা, ছারপোকা ও মাকড়সার উপদ্রবের উপমা ব্যবহার করে বিরোধীদের কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছনো এবং দলের শক্তি প্রদর্শন করা জরুরি। সেই লক্ষ্যেই বারুইপুরে সভার আয়োজন।
সভায় জনসমাগমের প্রসঙ্গ তুলে দেবাংশু পাণ্ডের উদ্যোগকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতা বিভাগের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভাগীয় কনভেনার হিসেবে তাঁর কাজের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। একটি রাজনৈতিক সভাকে জনসমুদ্রে পরিণত করার জন্য দলীয় নেতৃত্বের এই উদ্যোগকে অভিনন্দন জানান।
বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি আরও মজবুত করা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উপরেও গুরুত্ব দেন তিনি।
নিজের রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুটি বিধানসভা কেন্দ্রেই তিনি নির্বাচনে লড়েছেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মানুষের আস্থা ও সমর্থনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
সংখ্যালঘু মুসলিম জনসংখ্যা বেশি থাকলে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে জয়লাভ করা কঠিন—এমন রাজনৈতিক প্রচারের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তোলেন তিনি। রেজিনগরের ৭০-৩০ সমীকরণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কীভাবে সেখানে পদ্মফুল ফুটল, সেই প্রশ্নও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ধর্মীয় বা জনসংখ্যাগত সমীকরণ দিয়ে নির্বাচনী ফলাফলকে এককভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
সভায় রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রসঙ্গে জনপ্রিয় সিনেমার সংলাপের অনুকরণে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। ‘পুষ্পা ঝুঁকেগা নেহি’ কথাটির পরিবর্তে ‘পুষ্পা লড়েগা নেহি’ বলে রাজনৈতিক কটাক্ষ করেন তিনি। এই মন্তব্যের মাধ্যমে বিরোধীদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ব্যঙ্গ করেন বলে সভার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি বলেন, এটি কেবল শুরু। কলকাতা কর্পোরেশন ও হাওড়া এখনও বাকি রয়েছে। এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আগামী দিনে কলকাতা ও হাওড়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দলীয় সংগঠন নিয়ে তৃণমূলের পরিকল্পনা ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সভা থেকে সিপিএম নেতৃত্বকেও আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। সুজন চক্রবর্তী, সূর্যকান্ত মিশ্র-সহ বাম নেতৃত্বের নাম উল্লেখ করে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কটাক্ষ করেন। বামেদের বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান ও বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি।
একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, সিপিএমের অত্যাচার থেকে বাংলাকে মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েই তৃণমূলের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই সময় অটলবিহারী বাজপেয়ীর আশীর্বাদ ও সমর্থনের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্বে রাজনৈতিক সম্পর্ক ও সমীকরণ নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তৃণমূল ও বামেদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কটাক্ষ করতে গিয়ে ‘বেবি’ ও ‘আন্টি’ একসঙ্গে চা খাওয়ার উপমা ব্যবহার করেন। পাশাপাশি নিজেদের সম্পর্ককে ‘দুজন ভাই আর বোন’ বলে উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে বারুইপুরের সভা থেকে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি বিরোধীদের বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। দেবাংশু পাণ্ডের উদ্যোগ ও জনসমাগমের প্রশংসা, নির্বাচনী অভিজ্ঞতা, সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণ, কলকাতা-হাওড়ার প্রসঙ্গ এবং বাম-বিজেপিকে আক্রমণ—সব মিলিয়ে সভার মঞ্চ থেকে আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিলেন তিনি।