নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS) গড়ে তোলার দাবিকে সমর্থন জানালেও রাজ্যের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে AIIMS তৈরি হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু শুধু একটি বড় হাসপাতাল তৈরি করলেই রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নতি সম্ভব নয়। তার পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গ্রামীণ হাসপাতাল, মহকুমা হাসপাতাল এবং জেলা হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে এসেছে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার মানুষের চিকিৎসা পরিষেবা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, হাসপাতালের পরিকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলি তিনি তুলে ধরেছেন।
রায়গঞ্জে AIIMS তৈরির প্রস্তাবের প্রসঙ্গ
পশ্চিমবঙ্গে AIIMS তৈরির প্রসঙ্গে অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেন, এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রাজ্যে গড়ে উঠুক, তা তাঁরাও চান। তবে কোথায় এই প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হবে, তা নিয়ে পরিকল্পিত চিন্তাভাবনা প্রয়োজন ছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রায়গঞ্জে AIIMS তৈরির প্রস্তাব নিয়ে প্রথম থেকেই সুচিন্তিত আলোচনা ছিল। রায়গঞ্জে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেতে পারতেন।
তিনি জানান, রায়গঞ্জে AIIMS তৈরির বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু আলোচনাও হয়েছিল। তাঁর মতে, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসার সুবিধার কথা বিবেচনা করে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান কোথায় তৈরি হবে, তা নির্ধারণ করা উচিত।
শুধু AIIMS নয়, বুনিয়াদি স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নও জরুরি
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যের মূল সুর হল, রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হলে শুধু বড় হাসপাতাল নির্মাণের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। বরং সাধারণ মানুষ প্রতিদিন যে স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর নির্ভর করেন, সেই প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
তাঁর কথায়, রাজ্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত বহু জায়গায় পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। কোথাও চিকিৎসকের অভাব, কোথাও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নেই, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পরিষেবার ঘাটতি রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ সময়মতো চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তিনি মনে করেন, শহরাঞ্চলে কিছু উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও গ্রামীণ এলাকার মানুষের পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন। গ্রামের কোনও মানুষ অসুস্থ হলে অনেক সময় তাঁকে চিকিৎসার জন্য দূরের শহর বা বড় হাসপাতালে যেতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনই আর্থিক চাপও বাড়ে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ
রাজ্যের ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলির প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, শয্যা, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা কতটা কার্যকর, সেই বিষয়গুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, সংক্রামক রোগের মোকাবিলায় শুধু প্রচার বা সাময়িক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, দ্রুত চিকিৎসা শুরু এবং হাসপাতালের পর্যাপ্ত পরিকাঠামো থাকা অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত দুর্বল থাকলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন।
চিকিৎসকদের প্রতিবাদও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্যার ইঙ্গিত
রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে চিকিৎসকদের অসন্তোষ এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে। চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ, হাসপাতালের পরিকাঠামো এবং চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, সেগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি পর্যাপ্ত পরিকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না পান, তাহলে তার প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক চিকিৎসা পরিষেবার উপর। তাই চিকিৎসকদের সমস্যার সমাধান এবং হাসপাতালের কাজের পরিবেশ উন্নত করাও সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।
গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে বড় প্রশ্ন
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে গ্রামের মানুষের চিকিৎসা পরিষেবা। তাঁর মতে, শহরের মানুষের তুলনায় গ্রামীণ এলাকার মানুষ অনেক বেশি স্বাস্থ্য পরিষেবার সংকটে ভোগেন। শহরে কিছু বড় হাসপাতাল, বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সুযোগ থাকলেও প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছে সেই সুবিধা সবসময় পৌঁছয় না।
অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের অন্য হাসপাতালে যেতে হয়। আবার জেলা হাসপাতালে পৌঁছেও সব ধরনের চিকিৎসা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে রোগীর পরিবারকে কলকাতা বা অন্য বড় শহরের হাসপাতালের উপর নির্ভর করতে হয়।
এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে হলে প্রতিটি ব্লক এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিকাঠামো উন্নত করা, চিকিৎসকের শূন্যপদ পূরণ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি পরিষেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
AIIMS হোক, কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিতও মজবুত করতে হবে
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যের সারমর্ম, AIIMS-এর মতো উন্নত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গে গড়ে উঠলে তা অবশ্যই রাজ্যের মানুষের জন্য বড় প্রাপ্তি হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি উন্নত AIIMS-এ মানুষ বিশেষায়িত চিকিৎসা পেতে পারেন, কিন্তু প্রতিদিনের অসুস্থতা, জ্বর, সংক্রমণ, মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিষেবা কিংবা জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপরই নির্ভর করতে হয়। সেই ব্যবস্থাই যদি দুর্বল থাকে, তাহলে শুধুমাত্র বড় হাসপাতাল নির্মাণ করে স্বাস্থ্য পরিষেবার সামগ্রিক সংকট দূর করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। একদিকে পশ্চিমবঙ্গে AIIMS প্রতিষ্ঠার দাবি, অন্যদিকে প্রাথমিক থেকে জেলা স্তর পর্যন্ত স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সংস্কার। তাঁর মতে, উন্নত চিকিৎসার বড় প্রতিষ্ঠান যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াও সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যে নতুন AIIMS তৈরির পরিকল্পনার পাশাপাশি কি এবার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল উন্নয়নে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে? সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রশ্নই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।