নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে পরপর এনকাউন্টারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। বারুইপুরের পর গাইঘাটায় এনকাউন্টারের ঘটনা সামনে আসতেই পুলিশের ভূমিকা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, অপরাধীদের প্রতি কোনও ধরনের সহানুভূতি দেখানোর প্রশ্ন নেই। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দোষীদের কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত। তবে সেই শাস্তি দেওয়ার অধিকার পুলিশের নয়, তা নির্ধারণ করবে দেশের বিচারব্যবস্থা।
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যের মূল সুর, অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ কোনওভাবেই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে আইন মেনে তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতের মাধ্যমে বিচার সম্পন্ন হওয়াই হওয়া উচিত অপরাধ দমনের প্রধান পথ। পুলিশের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু সেই ক্ষমতারও সাংবিধানিক সীমা রয়েছে।
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্য, পুলিশের কাজ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা, অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আইন মেনে তাকে আদালতের সামনে হাজির করা। কিন্তু কোনও অভিযুক্তকে বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার পুলিশের নেই। তাঁর মতে, অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, দেশের সংবিধান ও আইনি ব্যবস্থার নির্ধারিত পথেই তার বিচার হওয়া জরুরি।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের মামলার অভিযুক্ত প্রবাশ মণ্ডলের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়। এরপর উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যু হয় পুলিশি গুলিতে।
পুলিশের দাবি, অপরাধের পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁরা পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালানোর চেষ্টা করেন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। তবে একই ধরনের পরিস্থিতিতে পরপর এমন ঘটনা ঘটায় পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং গোটা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—অভিযুক্তের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা কীভাবে ঘটছে? পুলিশের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণে কোনও ঘাটতি রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অধীরের বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি অপরাধীদের শাস্তির বিরোধিতা করছেন না। বরং গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দোষীদের কঠোর শাস্তির পক্ষেই সওয়াল করছেন। তবে তাঁর আপত্তি বিচারপ্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে কোনও অভিযুক্তের মৃত্যুকে অপরাধ দমনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা নিয়ে।
তাঁর মতে, কোনও ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করার সুযোগ নেই। তদন্তের মাধ্যমে অপরাধের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং আদালতের বিচারেই অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বারুইপুরের ঘটনার পর কলকাতা হাইকোর্টে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নিয়ে মামলা হয়েছে। আদালত রাজ্যের কাছে তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত রিপোর্ট এবং হলফনামা চেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি এনকাউন্টারের ঘটনায় কী ঘটেছিল, পুলিশের দাবি কতটা প্রমাণসাপেক্ষ এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যের শেষ কথা, ভারত একটি সংবিধান পরিচালিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে অপরাধী, পুলিশ কিংবা সরকার—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু সেই ব্যবস্থা হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে।
তাঁর দাবি, প্রতিটি এনকাউন্টারের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং প্রকৃত সত্য মানুষের সামনে আসা দরকার। অপরাধ দমনের নামে বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করা কোনওভাবেই কাম্য নয়।
বাংলায় বন্দুকের শাসন নয়, প্রতিষ্ঠিত হোক আইনের শাসন—এনকাউন্টার বিতর্কে অধীর রঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে এল এই সাংবিধানিক প্রশ্নই।