নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: আজকের রানাঘাট রেলস্টেশনকে দেখলে বোঝা কঠিন, একসময় অবিভক্ত বাংলার রেল যোগাযোগে এই স্টেশনটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ১৯৪০ সালের সময়কালে রানাঘাট ছিল এক ব্যস্ত রেল জংশন—যেখান থেকে পূর্ববঙ্গ, মুর্শিদাবাদ, উত্তরবঙ্গ এবং কলকাতার দিকে রেল যোগাযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল।
রানাঘাটের রেল ইতিহাস উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের। ২৯ সেপ্টেম্বর ১৮৬২ সালে শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট পর্যন্ত প্রথম ট্রেন চলাচল শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে এই রেলপথ ছিল Eastern Bengal Railway-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরবর্তী সময়ে কলকাতা থেকে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারিত হয়। সে সময় হুগলি নদীর উপর বর্তমানের মতো রেল সেতু ছিল না। ফলে কলকাতা ও পূর্ববঙ্গের রেল যোগাযোগের কাঠামোও আজকের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
১৯৪০-এর দশকে রানাঘাট কার্যত একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশনে পরিণত হয়েছিল। একাধিক রেলপথ এসে এখানে যুক্ত হওয়ায় পূর্ববঙ্গ এবং বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রানাঘাটের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
তৎকালীন রেলপথগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—
শিয়ালদহ–রানাঘাট–গেদে মেইন লাইন, যা গেদে হয়ে পূর্ববঙ্গের দিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল।
রানাঘাট–বনগাঁ লাইন, যার মাধ্যমে যশোর ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়।
রানাঘাট–লালগোলা শাখা, যা মুর্শিদাবাদ অভিমুখে যোগাযোগের পথ খুলে দেয়।
শান্তিপুর লুপ, যা নদিয়ার অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ফলে ১৯৪০-এর দশকে রানাঘাট ছিল কলকাতা থেকে উত্তর ও পূর্ব বাংলার দিকে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলদ্বার।
১৯৪০ সালে রানাঘাট স্টেশনে আজকের মতো বিদ্যুতচালিত ট্রেন চলত না। রেলপথে প্রধান ভরসা ছিল কয়লাচালিত বাষ্পীয় ইঞ্জিন। রানাঘাট ও আশপাশের রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হয় আরও পরে।
সেই সময় স্টেশনের পরিকাঠামোও ছিল বর্তমানের তুলনায় অনেক সরল। ইটের তৈরি স্টেশন ভবন, কাঠের দরজা-জানলা, টিনের ছাউনি, প্ল্যাটফর্মে জলের ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে ছিল ব্রিটিশ আমলের রেলস্টেশনের স্বতন্ত্র পরিবেশ।
যাত্রীদের পোশাক-পরিচ্ছদও সেই সময়ের সমাজজীবনের ছবি তুলে ধরত। পুরুষদের ধুতি-পাঞ্জাবি এবং মহিলাদের শাড়ি ও ঘোমটা ছিল স্টেশনের সাধারণ দৃশ্য।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পূর্ব ভারত ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। সামরিক কর্মী, সরঞ্জাম ও বিভিন্ন ধরনের রসদ পরিবহনে পূর্ব ভারতের রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রানাঘাটের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই সময়েও এর রেল যোগাযোগের গুরুত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। কলকাতা থেকে পূর্ববঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই রেলপথগুলি কৌশলগত গুরুত্ব বহন করত।
পূর্ববঙ্গের অর্থনীতিতে পাট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। রেলপথের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববঙ্গের কৃষি ও শিল্পাঞ্চল থেকে পাটসহ বিভিন্ন পণ্য কলকাতা এবং কলকাতা বন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়া।
রানাঘাট সেই বৃহত্তর পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে গড়ে ওঠে। পাটের পাশাপাশি চাল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবহনেও এই রেলপথের ভূমিকা ছিল।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অবিভক্ত বাংলার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। যে রেলপথগুলি আগে একই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছিল, সেগুলির একটি অংশ আন্তর্জাতিক সীমান্তের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ফলে রানাঘাটের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের বহু পুরনো রেল যোগাযোগের চরিত্রও বদলে যায়। গেদে সীমান্ত দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ রেল যোগাযোগ পরবর্তী সময়ে নতুন কাঠামোয় ফিরে এলেও দেশভাগের আগের সেই অবিচ্ছিন্ন রেল নেটওয়ার্ক আর একইভাবে থাকেনি।
আজকের রানাঘাট স্টেশন তাই শুধু একটি রেলস্টেশন নয়—এটি অবিভক্ত বাংলার রেল, বাণিজ্য, যুদ্ধকালীন যোগাযোগ এবং দেশভাগের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ১৯৪০ সালের রানাঘাটকে মনে করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে কয়লার ধোঁয়া ছড়ানো স্টিম ইঞ্জিন, টিনের ছাউনির প্ল্যাটফর্ম এবং ব্যস্ত রেলজংশন—যে জংশন একসময় বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র ছিল।