Home ফ্যাক্ট ফাইল পঞ্চায়েতের পাঁচ কাহন পৌর বার্তা জেলার চালচিত্র চাষী ভাই বলছি শরীর স্বাস্থ্য জেলার সেনাপতি মাঠে ময়দানে সম্পাদকিয় কলম
BREAKING NEWS
গুণমান ও খাদ্যনিরাপত্তা মেনে বিশ্ববাজারে ভারতীয় কৃষিপণ্যের প্রবেশ   •   পেট ফাঁপা ও গ্যাস: কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিকারের উপায়   •   নেপালে নিখোঁজ মুকুল রায়ের পুত্রবধূকে ঘিরে নতুন আশার খবর, চিনে থাকার সূত্র   •   নাগরিক সচেতনতাতেই গড়ে উঠবে পরিচ্ছন্ন ও টেকসই গ্রাম   •   কলম পদ্ধতিতে বদলাচ্ছে কৃষির চিত্র, উৎপাদনের পাশাপাশি বাড়ছে ফসলের গুণমান   •   মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়নি! চিন্ময় প্রভুর পাশে দাঁড়িয়ে ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র’-কে কাঠগড়ায় তসলিমা

স্বায়ত্তশাসনে কোপ, নাকি উচ্চশিক্ষায় সমবণ্টনের চেষ্টা?

12 Sep 2026
06:34 PM

 

 

সম্পাদকের কলমে :রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের আন্তঃ-বিশ্ববিদ্যালয় বদলির বিধান। ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ় অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’-কে ঘিরে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি সামনে আসছে, তা হল—এটি কি পিছিয়ে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে দক্ষ মানবসম্পদ পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের উপর নতুন করে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ?

বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা আন্তঃ-বিশ্ববিদ্যালয় বদলি ব্যবস্থার যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। রাজ্যের নতুন ও ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং বিশেষজ্ঞ মানবসম্পদের ঘাটতি থাকলে সেখানে দক্ষ অধ্যাপকদের সাময়িক বা প্রয়োজনভিত্তিকভাবে পাঠানোর মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কলকাতা বা অন্যান্য পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিপুল অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে, তার সুফল যদি প্রান্তিক অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা পান, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি সরকারি দফতর নয়। তার নিজস্ব একাডেমিক পরিবেশ, গবেষণার পরিকাঠামো, বিভাগীয় কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। একজন অধ্যাপকের সঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক শুধুমাত্র চাকরির সম্পর্ক নয়; তাঁর গবেষণা, ছাত্রছাত্রী, গবেষক, ল্যাবরেটরি এবং একাডেমিক প্রকল্পের সঙ্গে সেই সম্পর্ক গভীরভাবে যুক্ত। ফলে বদলির সিদ্ধান্ত যদি যথেষ্ট স্বচ্ছ, নির্দিষ্ট ও একাডেমিক যুক্তির ভিত্তিতে না হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়তে পারে গবেষণা ও শিক্ষার ধারাবাহিকতার উপর।

আর এখানেই আসে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন।

সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ থাকবে—এমন ধারণা উচ্চশিক্ষার মৌলিক চরিত্রের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। আবার উল্টো দিকটিও সত্যি—স্বায়ত্তশাসনের অর্থ কখনওই প্রশাসনিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাধীনতা দিতে হবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং জনস্বার্থের প্রতিও দায়বদ্ধতা থাকতে হবে।

তবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার।

শিক্ষক সমাজের একাংশের আশঙ্কা, আন্তঃ-বিশ্ববিদ্যালয় বদলির ক্ষমতা যদি যথেষ্ট সুরক্ষা ও নিরপেক্ষতার কাঠামো ছাড়া প্রয়োগ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মতপার্থক্য বা রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে কোনও শিক্ষককে দূরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর অভিযোগ উঠতে পারে। এই আশঙ্কা সত্যি হোক বা না হোক, আইন প্রণয়নের সময় এমন সম্ভাবনা রুখতে স্পষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কারণ কোনও প্রশাসনিক ক্ষমতার গ্রহণযোগ্যতা শুধু তার উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে না; তার অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাই প্রশ্নটি কেবল ‘বদলি হবে কি হবে না’—এতটা সরল নয়।

প্রশ্ন হল, কে বদলি করবেন, কোন মানদণ্ডে করবেন, কতদিনের জন্য করবেন এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের আপিলের সুযোগ থাকবে কি না। পাশাপাশি গবেষণা, পিএইচডি তত্ত্বাবধান, চলমান প্রকল্প এবং বিভাগের প্রয়োজনীয়তার মতো একাডেমিক বিষয়গুলিও বিবেচনায় নেওয়া হবে কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

সরকার যদি সত্যিই প্রান্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উন্নয়নকে লক্ষ্য করে থাকে, তাহলে সেই উদ্দেশ্যকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলার পথও রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী বদলি, নির্দিষ্ট মেয়াদের ডেপুটেশন, বিশেষজ্ঞ ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, যৌথ গবেষণা প্রকল্প এবং পুরনো-নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একাডেমিক সহযোগিতার মতো বিকল্প ব্যবস্থাও তৈরি করা যেতে পারে। তাতে অভিজ্ঞতার আদানপ্রদান হবে, আবার স্থায়ী বদলির আশঙ্কাও কমবে।

শেষ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার প্রশ্নে কোনও পক্ষকেই শুধু রাজনৈতিক চশমায় বিষয়টি দেখা উচিত নয়।

সরকারের কাছে এটি যদি মানবসম্পদের সুষম বণ্টনের প্রকল্প হয়, তবে তার প্রমাণ দিতে হবে স্বচ্ছ নিয়মে। আর শিক্ষক সংগঠনগুলির কাছে যদি এটি স্বায়ত্তশাসনের উপর আঘাত বলে মনে হয়, তবে সেই আপত্তিরও যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা সামনে আসা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করতে হলে একদিকে যেমন সরকারের জবাবদিহি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা দরকার, অন্যদিকে তেমনই দরকার একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রতিষ্ঠানগত স্বায়ত্তশাসন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে ক্ষতি কোনও একটি পক্ষের নয়—ক্ষতি হবে রাজ্যের ছাত্রছাত্রী, গবেষক এবং সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার।

তাই এখন মূল নজর বিলের উদ্দেশ্যের চেয়ে তার প্রয়োগের পদ্ধতিতে

স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করেও কি প্রান্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক পৌঁছে দেওয়া সম্ভব? নাকি প্রশাসনিক ক্ষমতার বিস্তারই হয়ে উঠবে এই সংশোধনীর প্রধান ফল?

এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে—২০২৬-এর এই বিশ্ববিদ্যালয় বদলি বিধান ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার সংস্কার হিসেবে পরিচিত হবে, নাকি বিতর্কিত সরকারি নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে।

news home ads