নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: VB-G RAM G প্রকল্পে গ্রামবাংলায় জ্বালানি খরচ কমানো ও বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ। ইতিমধ্যেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে সাতটি প্ল্যান্টের।গ্রামবাংলার গবাদি পশুর গোবর এবার হয়ে উঠতে চলেছে রান্নার জ্বালানি তৈরির অন্যতম উৎস। গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করে তা রান্নার কাজে ব্যবহার করার অভিনব উদ্যোগ শুরু করেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর-১ ব্লক প্রশাসন। কেন্দ্রীয় সরকারের VB-G RAM G প্রকল্পের অধীনে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, একদিকে যেমন গ্রামের মানুষের রান্নার জ্বালানির খরচ কমানো, অন্যদিকে তেমনই গোবরের সঠিক ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব বিকল্প শক্তির প্রসার ঘটানো।
জয়নগর-১ ব্লক প্রশাসনের এই উদ্যোগে ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ব্লকের মোট ৭৩ জন একাধিক গবাদি পশুর মালিক বা মাল্টিপল ক্যাটেল ফার্মারকে এই প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের বাড়ি বা খামারে গোবর গ্যাস প্ল্যান্ট তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে পর্যায়ক্রমে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে জাঙ্গালিয়া গ্রামে তৈরি হয়েছে প্রথম দুটি গোবর গ্যাস প্ল্যান্ট। পাশাপাশি আরও সাতটি প্ল্যান্টের কাজ মাঠপর্যায়ে চলছে বলে ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
জাঙ্গালিয়ায় প্রথম সাফল্য, তৈরি দুটি প্ল্যান্ট
জয়নগর-১ ব্লকের জাঙ্গালিয়া গ্রামে এই প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজ প্রথম শুরু হয়। সেখানে ইতিমধ্যেই দুটি গোবর গ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি হয়েছে। গোবরকে জৈব প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে রান্নার কাজে বিকল্প জ্বালানি পাওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব পরিবারের একাধিক গবাদি পশু রয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত গোবর পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফলে সেই পরিবারগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্ল্যান্ট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গোবরের নিয়মিত জোগান থাকলে বায়োগ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে। এতে পরিবারের দৈনন্দিন রান্নার কাজে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
ব্লক প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ৭৩ জন খামারিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার মধ্যে দুটি প্ল্যান্ট সম্পূর্ণ তৈরি হয়েছে এবং সাতটি প্ল্যান্টের কাজ চলছে। আগামী দিনে বাকি উপযুক্ত উপভোক্তাদের কাছেও এই প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কীভাবে গোবর থেকে তৈরি হয় রান্নার গ্যাস?
গোবর গ্যাস বা বায়োগ্যাস উৎপাদনের পদ্ধতি বেশ সহজ হলেও এর পিছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈব প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট চেম্বার বা বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে গোবর ও জল মিশিয়ে রাখা হয়। সেখানে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে বিশেষ ধরনের অণুজীব জৈব পদার্থকে ভেঙে গ্যাস তৈরি করে। এই গ্যাসের প্রধান উপাদান মিথেন। উপযুক্ত পরিকাঠামো ও নিরাপদ সংযোগের মাধ্যমে সেই গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়।
এই প্রক্রিয়ায় গোবরের কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হয়। পাশাপাশি গ্যাস উৎপাদনের পর যে অবশিষ্ট জৈব পদার্থ থাকে, তা যথাযথভাবে প্রক্রিয়াকরণ করে কৃষিকাজে জৈব সার হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে একই উপকরণ থেকে জ্বালানি ও কৃষির উপযোগী উপাদান পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
রান্নার খরচ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্য
গ্রামাঞ্চলের বহু পরিবার এখনও রান্নার জন্য এলপিজি, কাঠ, কয়লা কিংবা অন্যান্য জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের মাসিক খরচের উপর তার প্রভাব পড়ে। এই পরিস্থিতিতে গোবর থেকে তৈরি বায়োগ্যাস ব্যবহার করা গেলে উপযুক্ত পরিবারের রান্নার জ্বালানি খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব পরিবারের একাধিক গবাদি পশু রয়েছে, তাঁদের কাছে গোবর সহজলভ্য একটি উপকরণ। আগে অনেক ক্ষেত্রে এই গোবর মূলত সার হিসেবে ব্যবহৃত হত। এবার সেই গোবরকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে গোবরের অর্থনৈতিক মূল্যও বাড়তে পারে।
পরিবেশের দিক থেকেও বায়োগ্যাসের গুরুত্ব রয়েছে। এটি একটি নবীকরণযোগ্য জৈব জ্বালানি। সঠিকভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার করা গেলে প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি গোবরের যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির পথও খুলে যায়।
VB-G RAM G প্রকল্পে কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ উন্নয়নের সম্ভাবনা
জয়নগর-১ ব্লকের এই উদ্যোগ VB-G RAM G প্রকল্পের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ। প্রশাসনের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। গোবর গ্যাস প্ল্যান্ট তৈরিও তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কর্মসূচিতে গ্রামীণ পরিবারগুলির জন্য ১২৫ দিনের কর্মসংস্থানের সুযোগের কথা রয়েছে। আগে ১০০ দিনের কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থায় কর্মদিবস বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এই প্রকল্পের আওতায় ব্লকজুড়ে প্রায় ৩৭২টি উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় স্তরে কাজের সুযোগ তৈরি হলে এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গোবর গ্যাস প্ল্যান্ট নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পর্যায়ে স্থানীয় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মিশন মোডে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
জয়নগর-১ ব্লকে ইতিমধ্যেই যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে, তাকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের। চিহ্নিত ৭৩ জন খামারির কাছে পর্যায়ক্রমে প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং নির্মিত প্ল্যান্টগুলির কার্যকারিতা বজায় রাখাই এখন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। পাশাপাশি, গোবর গ্যাসের ব্যবহার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন।
এই ধরনের প্রকল্প সফল করতে শুধু প্ল্যান্ট তৈরি করলেই হবে না। নিয়মিত গোবরের জোগান, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার এবং উপভোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। প্ল্যান্ট তৈরির পর তা বাস্তবে কতটা গ্যাস উৎপাদন করছে এবং পরিবারের রান্নার কাজে কতটা ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেই বিষয়েও নজর রাখা জরুরি।
জেলা জুড়ে এই উদ্যোগকে জনপ্রিয় করে তুলতে মিশন মোডে কাজ করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। জয়নগর-১ ব্লকের প্রাথমিক অগ্রগতি আগামী দিনে অন্যান্য এলাকাতেও এই ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, জয়নগর-১ ব্লকের গোবর গ্যাস প্রকল্প গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক অভিনব ভাবনার পরিচয় দিচ্ছে। গবাদি পশুর বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করে রান্নার জ্বালানি তৈরি, পরিবারের খরচ কমানোর সম্ভাবনা এবং বিকল্প শক্তির প্রসার—এই তিনটি দিককে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাঙ্গালিয়ায় তৈরি প্রথম দুটি প্ল্যান্টের পর আগামী দিনে বাকি উপভোক্তাদের বাড়িতেও এই প্রকল্প কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।