নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: নাবালিকা ছাত্রীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া মূল অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায়। অপরাধস্থলের পুনর্নির্মাণের পর ফেরার পথে পুলিশের ওপর গুলি চালানো এবং পুলিশের সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পালটা গুলি চালায় বলে দাবি। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অভিযুক্তকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানা গিয়েছে।
মঙ্গলবার ভোররাতের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়েছে। নাবালিকা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্তের মৃত্যু ঘিরে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কী পরিস্থিতিতে পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনা ঘটল, অভিযুক্তের কাছে কীভাবে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছল এবং গোটা ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা কী ছিল—সেই সমস্ত বিষয় এখন তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার রাতে। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষে আয়োজিত একটি জলসা দেখতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল একাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রী। কিন্তু রাত গড়িয়ে গেলেও সে বাড়ি ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সম্ভাব্য বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন পরিবারের লোকজন। পরিচিতদের কাছেও খোঁজ নেওয়া হয়।
কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে খোঁজ চালিয়েও ছাত্রীর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিখোঁজের ঘটনাকে ঘিরে পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়।
পরদিন, অর্থাৎ রবিবার সকালে প্রতিবেশীর বাড়ির পিছন থেকে ওই ছাত্রীর ক্ষতবিক্ষত ও অর্ধনগ্ন দেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানা গিয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। যে ছাত্রী আগের রাতে জলসা দেখতে বেরিয়েছিল, পরদিন সকালে তার দেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়।
ছাত্রীর দেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। কীভাবে ওই ছাত্রীর মৃত্যু হল, মৃত্যুর আগে তার ওপর কোনও যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল কি না এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন তদন্তকারীরা।
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের সূত্র ধরে শিমুলপুরের বাসিন্দা প্রহ্লাদ দাসকে গ্রেফতার করা হয়। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
তবে গ্রেফতারের পর থেকেই মামলাটি ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। একদিকে নাবালিকার মৃত্যুতে বিচার চেয়ে সরব হন স্থানীয় বাসিন্দারা, অন্যদিকে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সমস্ত দিক সামনে আনার দাবি ওঠে। পুলিশের কাছে এই মামলার তদন্ত ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একজন নাবালিকার মৃত্যু এবং তার সঙ্গে ধর্ষণের অভিযোগ জড়িয়ে ছিল।
তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসকে নিয়ে অপরাধস্থলের পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছিল বলে জানা গিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তদন্তকারীরা ঘটনার সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি, অভিযুক্তের ভূমিকা এবং অপরাধ সংঘটনের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোররাতে সেই পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ করে অভিযুক্তকে নিয়ে ফিরছিল পুলিশ বাহিনী। সেই সময়ই পরিস্থিতি আচমকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রাথমিকভাবে পাওয়া বিবরণ অনুযায়ী, অভিযুক্ত পুলিশের সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। এরপর পুলিশের দিকে গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই পালটা গুলি চালানো হয়।
এই গুলির ঘটনায় প্রহ্লাদ দাস গুরুতর জখম হয়। এরপর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানা গিয়েছে।
তবে গোটা ঘটনায় ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, কত রাউন্ড গুলি চলেছিল, পুলিশের কতজন সদস্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং অভিযুক্তের কাছে কীভাবে সার্ভিস রিভলভার পৌঁছেছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এই ঘটনাকে ঘিরে অনেকেই বারুইপুরের একটি আলোচিত অপরাধ ও পুলিশি অভিযানের প্রসঙ্গ টানছেন। সেই কারণেই গাইঘাটার ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নাবালিকার ওপর যৌন নির্যাতন ও হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্তের মৃত্যু এবং পুলিশের পালটা গুলি চালানোর ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে, অভিযুক্তকে গ্রেফতারের পর তদন্তের স্বার্থে নিয়ে যাওয়ার সময় কীভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল, তা জানতে আগ্রহী স্থানীয় বাসিন্দারা।
তবে দুটি ঘটনার মধ্যে প্রকৃতিগত বা তদন্তসংক্রান্ত কোনও মিল রয়েছে কি না, তা নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই বারুইপুরের ঘটনার সঙ্গে গাইঘাটার ঘটনাকে তুলনা করার আগে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা জরুরি।
প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুর ফলে নাবালিকা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এবং অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য কোনও সূত্র রয়েছে কি না, সেসব বিষয় তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযুক্তের মৃত্যু হলেও ছাত্রীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল এবং সংগৃহীত অন্যান্য প্রমাণের গুরুত্ব কমে যায় না। বরং এই সমস্ত তথ্যের ভিত্তিতেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আনা সম্ভব।
পাশাপাশি, পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনাটিও স্বচ্ছভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়ে থাকলে, সেই দাবির সমর্থনে কী কী প্রমাণ রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। ঘটনাস্থলের প্রমাণ, আগ্নেয়াস্ত্রের ফরেনসিক পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের বিবৃতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীর এমন মর্মান্তিক পরিণতিতে পরিবার ও এলাকার মানুষের মধ্যে শোক এবং ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। একটি উৎসবের রাতে জলসা দেখতে বেরিয়ে যাওয়া ছাত্রীকে পরদিন মৃত অবস্থায় উদ্ধার করার ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অভিযুক্তের মৃত্যুকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কেও স্বচ্ছ তথ্য সামনে আসা প্রয়োজন।
গাইঘাটার এই ঘটনায় আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নাবালিকা ছাত্রীর মৃত্যুর পিছনে ঠিক কী ঘটেছিল এবং পুলিশের গুলি চালানোর পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হল।