নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আইসিসি ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে খেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত বলে ঘোষণা করলেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিন। পেটের পেশিতে চোটের কারণে সিরিজের প্রথম দুই টেস্টে খেলতে পারেননি তিনি। তবে চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরার প্রস্তুতি শুরু করেছেন ২৭ বছর বয়সি এই ক্রিকেটার। সিরিজ এখন ১-১ ব্যবধানে সমতায় থাকায় আগামী তৃতীয় টেস্টকে ঘিরে দুই শিবিরেই বাড়ছে উত্তেজনা।
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সিরিজ জয়ের লক্ষ্যে নামার আগে অস্ট্রেলিয়ার কাছে বড় স্বস্তির খবর ক্যামেরন গ্রিনের ফিটনেস। শনিবার কেপ টাউনের নিউল্যান্ডস স্টেডিয়ামে ঐচ্ছিক অনুশীলন পর্বে অংশ নেন তিনি। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নেটে ব্যাটিং করেন এই ডানহাতি ব্যাটার। অনুশীলনে তাঁর ব্যাটিংয়ের ছন্দও নজর কেড়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে সিরিজের শেষ টেস্টে তাঁকে প্রথম একাদশে ফেরানোর সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
গ্রিন জানিয়েছেন, তিনি মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত। তবে চোট থেকে ফিরে আপাতত তাঁকে বোলিং করতে দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দলের প্রয়োজনে ব্যাটার হিসেবেই খেলতে পারেন তিনি। অর্থাৎ, গ্রিনের প্রত্যাবর্তন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিভাগকে শক্তিশালী করলেও বোলিংয়ে তাঁর অবদান পাওয়ার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে চোট পান গ্রিন। প্রতিপক্ষের বোলার করবিন বশের একটি বল তাঁর সংবেদনশীল স্থানে আঘাত করে। এর দু'টি বল পরেই শট খেলতে গিয়ে পেটের পেশিতে টান লাগে এবং পেশিতে চোট পান তিনি। এই অপ্রত্যাশিত চোটের কারণেই টেস্ট সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে মাঠে নামতে পারেননি অস্ট্রেলিয়ার এই অলরাউন্ডার।
চোটের ধরন ছিল কিছুটা বিরল। ফলে কত দ্রুত তিনি মাঠে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে প্রথম দিকে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসক ও দলের মেডিক্যাল টিমের পর্যবেক্ষণে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন গ্রিন। তাঁর নিজের বক্তব্যেও দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ পেয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শরীরের কার্যক্ষমতা অনেকটা ফিরে পাওয়ায় সিরিজের শেষ ম্যাচে খেলার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী তিনি।
তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা এবং প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে বোলিং করার উপযুক্ত অবস্থায় পৌঁছনো এক বিষয় নয়। তাই অস্ট্রেলিয়া টিম ম্যানেজমেন্ট তাঁকে কতটা ব্যবহার করবে, তা নির্ভর করবে ম্যাচের আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার মূল্যায়ন এবং দলের পরিকল্পনার উপর।
দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের প্রথম টেস্টে জয় পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়ায় প্রোটিয়ারা। গকেবেরহায় দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে এক ইনিংস ও ৩১ রানে হারিয়ে সিরিজে সমতা ফেরায় দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয় বিশেষভাবে নজরে আসে। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৯৯ রানে অলআউট হয়ে যায় তারা।
দ্বিতীয় টেস্টের এই হার অস্ট্রেলিয়ার দল নির্বাচন এবং ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের কাছ থেকে বড় রান না আসায় শেষ ম্যাচের আগে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রিনের প্রত্যাবর্তন দলের জন্য বাড়তি বিকল্প এনে দিতে পারে।
আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে কেপ টাউনের নিউল্যান্ডসে শুরু হওয়ার কথা সিরিজের তৃতীয় ও নির্ণায়ক টেস্ট। এই ম্যাচের ফলের উপর নির্ভর করবে তিন ম্যাচের সিরিজের চূড়ান্ত পরিণতি। একই সঙ্গে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়ে দুই দলের অবস্থানের দিক থেকেও ম্যাচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাটিং অর্ডারে নিজের ভূমিকা নিয়ে গ্রিন জানিয়েছেন, চার ও পাঁচ নম্বরে ব্যাট করতে তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। তবে দলের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য পজিশনেও ব্যাট করতে তাঁর আপত্তি নেই। অতীতে বিভিন্ন পজিশনে খেলার অভিজ্ঞতা থাকায় নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত তিনি।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক টেস্ট ম্যাচগুলিতে পাঁচ নম্বরে ব্যাট করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিলেন গ্রিন। একটি ম্যাচে শতরান এবং অন্য ইনিংসে ৬৭ রানের পারফরম্যান্স তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল। আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে নিজের স্বাভাবিক ব্যাটিংয়ের ধরন ফিরে পাওয়ার উপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
গ্রিনের অনুপস্থিতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টে ম্যাথু রেনশ দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছিলেন। ফলে গ্রিন ফিরলে ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন আনতে হতে পারে। নিক ম্যাডিনসনের জায়গা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি মার্নাস লাবুশেন এবং বিউ ওয়েবস্টারের পারফরম্যান্সও নির্বাচকদের বিবেচনায় আসতে পারে। জশ ইংলিস এবং কুপার কনলির মতো ক্রিকেটাররাও দলে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে গ্রিনকে কোন পজিশনে খেলানো হবে, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তিনি পাঁচ নম্বরে ফিরবেন, নাকি দলের প্রয়োজনে উপরের দিকে ব্যাট করবেন, সেই সিদ্ধান্তই হতে পারে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
গত কয়েক মাসে ব্যাটিংয়ের ধরন নিয়ে কাজ করেছেন গ্রিন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে তিনি নিজের স্বাভাবিক খেলার ধরন থেকে কিছুটা সরে গিয়েছিলেন। অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা না করে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাট করার দিকেই এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি।
শেফিল্ড শিল্ডের শেষ পর্বে শতরান করার পর সেই পরিবর্তনের সুফল পেয়েছিলেন গ্রিন। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বড় রান করার সময়ও তাঁর ব্যাটিংয়ে সংযম ও ভারসাম্য দেখা গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচেও কাজে লাগাতে চান তিনি।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং আক্রমণের সামনে কাজটা সহজ হবে না। কাগিসো রাবাডা, মার্কো ইয়ানসেনদের মতো বোলাররা দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে চাপে ফেলেছিলেন। নতুন বলে তাঁদের সামলানো এবং দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকাই হবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের কাছে বড় পরীক্ষা।
গ্রিনের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত হলে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম একাদশে অন্তত একটি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু শুধু গ্রিনকে দলে ফেরানোই নয়, ব্যাটিং অর্ডারের ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। ওপেনিং জুটি, তিন নম্বরের ব্যাটার এবং মিডল অর্ডারের অবস্থান নিয়ে নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অন্যদিকে, অভিজ্ঞ স্পিনার নাথান লায়নের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। নিউল্যান্ডসের পিচের চরিত্র এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনা করেই বোলিং বিভাগ সাজাতে চাইবে অস্ট্রেলিয়া। ফলে শেষ টেস্টের আগে দলের চূড়ান্ত একাদশ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকছে।
অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স আগেই জানিয়েছিলেন, গ্রিন ও জশ ইংলিস নির্বাচনের জন্য উপলব্ধ হলে দল গঠনের ক্ষেত্রে তাঁদের নাম বিবেচনায় আসবে। দ্বিতীয় টেস্টের পরাজয়ের পর ব্যাটিং বিভাগে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তাই আরও বেড়েছে।
চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরার জন্য প্রস্তুত হলেও গ্রিনের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। একদিকে দীর্ঘ বিরতির পর প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে রান করা—দুটি চ্যালেঞ্জই সামলাতে হবে তাঁকে।
অস্ট্রেলিয়ার কাছে এই ম্যাচ শুধু সিরিজ জয়ের লড়াই নয়, দ্বিতীয় টেস্টের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠারও সুযোগ। গ্রিনের মতো অভিজ্ঞ অলরাউন্ডারের প্রত্যাবর্তন দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। তবে তাঁর ফিটনেস, ব্যাটিং অর্ডার এবং দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে অস্ট্রেলিয়া কতটা শক্তিশালীভাবে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে লড়াই করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ক্যামেরন গ্রিনের মাঠে ফেরার প্রস্তুতি অস্ট্রেলিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক খবর। এখন নজর নির্বাচকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। ২৭ অক্টোবর থেকে শুরু হতে চলা কেপ টাউন টেস্টে গ্রিনকে প্রথম একাদশে দেখা যায় কি না, এবং তিনি ব্যাট হাতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন, সেটাই ক্রিকেটপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।