সম্পাদকের কলমে : ফলতা বিধানসভা বরাবরই দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র। একসময় বাম রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই বিধানসভা পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে আসে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তৃণমূলের শাসন ও রাজনৈতিক প্রভাব ফলতার মানুষের কাছে একটি দীর্ঘ অধ্যায় তৈরি করেছে। সেই সময়ের উন্নয়ন, প্রশাসনিক কাজ কিংবা রাজনৈতিক সংস্কৃতি—সবকিছুরই মূল্যায়ন এখন মানুষের স্মৃতির অংশ।
তবে রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর ফলতায় একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। নতুন বিধায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বিজেপির দেবাংশু পণ্ডা। পরিবর্তনের পর মাত্র কয়েকটি দিন কেটেছে। ফলে এই অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর সরকার বা বিধায়ক হিসেবে সামগ্রিক কাজের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা নিঃসন্দেহে তাড়াহুড়োর হবে। উন্নয়ন হয়েছে কি হয়নি, তার বিচার করতে সময় লাগবে।
কিন্তু একটি বিষয় ইতিমধ্যেই চোখে পড়ছে—মানুষের কাছে পৌঁছনোর রাজনীতিতে পরিবর্তন।
সামনে দুর্গাপুজো। বহু পরিবার এখনও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বস্ত্র বিতরণ এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছেন বর্তমান বিধায়ক দেবাংশু পণ্ডা। এখানেই প্রশ্ন উঠছে—এই কাজ তো আগেও হয়েছে। তৃণমূলের আমলেও বস্ত্র বিতরণ হয়েছে, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দাবি করা হয়েছে। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়?
পার্থক্যটা হয়তো কর্মসূচির ছবিতে নয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ধরনে।
তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনকালে ফলতার প্রাক্তন বিধায়ক শঙ্কর কুমার নস্করের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ কতটা সহজ ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ছিল। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, বিধায়কের কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব ছিল। জাহাঙ্গীর খানকে ঘিরেও সেই সময়ে নানা রাজনৈতিক আলোচনা ও অভিযোগ সামনে এসেছে। অবশ্য এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
একজন বিধায়কের কাছে পৌঁছতে যদি সাধারণ মানুষকে একাধিক স্তরের রাজনৈতিক যোগাযোগের উপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর সেই দূরত্বই যখন দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকে, তখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় মানুষ শুধু দলের পতাকা বদলান না—তাঁরা পরিবর্তন চান রাজনৈতিক আচরণেও।
দেবাংশু পণ্ডাকে ঘিরে তাঁর সমর্থকদের দাবি, তিনি সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করছেন।
তাঁদের বক্তব্য, কোনও অসহায় পরিবারের সমস্যার খবর পেলেই বর্তমান বিধায়ক সেখানে পৌঁছে যাচ্ছেন। ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া, বাড়িতে গিয়ে দেখা করার আগে বহু স্তরের অনুমতি—এই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে সরাসরি মানুষের দরজায় পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন তিনি।
এখানেই দেবাংশু পণ্ডার রাজনীতির একটি আলাদা ছবি তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে।
তিনি শুধু নিজেকে বিধায়ক হিসেবে দেখছেন না—সমর্থকদের ভাষায়, তিনি নিজেকে এলাকার অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন।
অবশ্য একজন বিধায়কের আসল পরীক্ষা শুধুমাত্র বস্ত্র বিতরণে নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার পাশাপাশি রাস্তা, পানীয় জল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক পরিষেবা এবং প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান—এসব ক্ষেত্রেও কাজ করতে হবে। আগামী দিনে দেবাংশু পণ্ডার মূল্যায়ন হবে এই সমস্ত ক্ষেত্রেই।
তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনকে ছোট করে দেখারও কারণ নেই।
কারণ রাজনীতিতে মানুষের কাছে যাওয়া এবং মানুষের থেকে দূরে থাকা—এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
দীর্ঘদিনের শাসনের পর নতুন জনপ্রতিনিধি যখন মানুষের বাড়িতে পৌঁছন, অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ান, পুজোর আগে বস্ত্র তুলে দেন, তখন সেটি নিছক একটি সামাজিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে ছবির একটি অংশই দেখা হয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক বার্তাও থাকে—ক্ষমতা বদলেছে, আর ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও বদলাতে পারে।
ফলতার মানুষ এখন সেই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হয়, সেটাই দেখতে চাইবেন।
কারণ তৃণমূলের আমলেও বস্ত্র বিতরণ হয়েছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ছবি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই সাহায্য কি মানুষের দরজায় পৌঁছেছিল সহজে? নাকি রাজনৈতিক পরিচয়, সুপারিশ এবং মধ্যস্থতার উপর নির্ভর করতে হত?
আজকের প্রশ্ন এখানেই।
বস্ত্র একই হতে পারে, কর্মসূচির নাম একই হতে পারে, কিন্তু রাজনীতির চরিত্র কি একই?
দেবাংশু পণ্ডার সমর্থকদের দাবি, এখানেই তফাৎ।
তাঁদের বক্তব্য, আগের ব্যবস্থায় মানুষকে জনপ্রতিনিধির কাছে পৌঁছতে হত; এখন জনপ্রতিনিধিই মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছেন। আগের রাজনীতিতে দলীয় কাঠামো ছিল বড়, আর বর্তমান বিধায়কের রাজনীতিতে মানুষের দরজা পর্যন্ত পৌঁছনোর চেষ্টা বেশি—এমনটাই তাঁরা তুলে ধরছেন।
তবে এখানেও একটি সতর্কতা জরুরি।
কোনও জনপ্রতিনিধিকে শুধুমাত্র কয়েকটি সামাজিক কর্মসূচির ভিত্তিতে সফল বা ব্যর্থ ঘোষণা করা যায় না। নতুন বিধায়ককে সময় দিতে হবে। তাঁর কাজের বাস্তব ফলাফল দেখতে হবে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ হচ্ছে, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় কেমন হচ্ছে, এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির কতটা সমাধান হচ্ছে—এসবই ভবিষ্যতের মূল্যায়নের মাপকাঠি হবে।
কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—ফলতার রাজনীতিতে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রশ্নটি এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
আর এখানেই তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা শুরু হয়েছে।
আগের বিধায়ক কী করেছিলেন এবং বর্তমান বিধায়ক কী করছেন—এই হিসাব শেষ পর্যন্ত জনগণই করবেন। রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের মতো করে সাফল্যের দাবি করবে, বিরোধীরা নিজেদের মতো করে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলবে। কিন্তু ভোটারদের অভিজ্ঞতা, তাঁদের দৈনন্দিন জীবন এবং জনপ্রতিনিধির সঙ্গে তাঁদের সরাসরি সম্পর্কই শেষ কথা বলবে।
দেবাংশু পণ্ডার সামনে তাই সুযোগ যেমন রয়েছে, দায়িত্বও তেমনই বড়।
মানুষের দরজায় পৌঁছনোর যে রাজনীতি তিনি শুরু করেছেন বলে তাঁর সমর্থকরা দাবি করছেন, সেটিকে যদি তিনি আগামী পাঁচ বছর ধরে প্রশাসনিক কাজ, উন্নয়ন এবং নাগরিক পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন, তাহলেই এই পরিবর্তনের প্রকৃত অর্থ প্রতিষ্ঠিত হবে।
কারণ রাজনীতি শুধু মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়ার বিষয় নয়।
রাজনীতি শুধু পোস্টার, পতাকা কিংবা মিছিলের বিষয়ও নয়।
রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মানুষের দরজায়।
যে বিধায়ক মানুষের সমস্যার খবর পেয়ে মানুষের কাছে পৌঁছবেন, তাঁর কাছে মানুষ নিজের কথা বলতে পারবেন—সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
ফলতার নতুন অধ্যায়ে দেবাংশু পণ্ডা সেই দাবি বাস্তবে কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তার উত্তর সময়ই দেবে।
তবে আপাতত একটি প্রশ্ন স্পষ্ট—
আগে মানুষ বিধায়কের কাছে যেতেন, এখন বিধায়ক মানুষের কাছে যাচ্ছেন—এই তফাৎটাই কি ফলতার রাজনৈতিক পরিবর্তনের আসল ছবি?
উত্তর দেওয়ার অধিকার শেষ পর্যন্ত ফলতার মানুষেরই।