নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ইলিশ মাছ বাঙালির অন্যতম প্রিয় মাছ। বর্ষা এলেই বাজারে ইলিশের চাহিদা বেড়ে যায়। গঙ্গা, হুগলি, পদ্মা, মেঘনা এবং বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন জলভাগে ইলিশ মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে বহু মৎস্যজীবী তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু ইলিশের উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখতে মাছ ধরার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ইলিশ ধরার সময় জালের ফাঁস বা Mesh Size সঠিক হওয়া দরকার।
অনেকেই হয়তো জানেন না, জালের ফাঁস ছোট বা বড় হওয়ার সঙ্গে ইলিশ মাছের সংরক্ষণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করলে অল্পবয়সি ইলিশ বা জাটকা সহজেই জালে আটকে যায়। ফলে সেই মাছ বড় হওয়ার আগেই বাজারে চলে আসে। এর ফলে ভবিষ্যতে ইলিশের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তাহলে ইলিশ মাছ ধরার ক্ষেত্রে সঠিক মাপের জাল কেন ব্যবহার করা হয়? পশ্চিমবঙ্গে এই বিষয়ে কী সরকারি নিয়ম রয়েছে? চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
ইলিশ মাছের জীবনচক্রে ছোট অবস্থায় বেড়ে ওঠার সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে ছোট ইলিশকে জালে ধরে ফেললে তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সুযোগ পায় না।
সঠিক মাপের ফাঁসযুক্ত জাল ব্যবহার করলে ছোট আকারের কিছু মাছ জালের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারে এবং পরবর্তীকালে প্রজননের মাধ্যমে ইলিশের বংশবিস্তারেও ভূমিকা রাখতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের মৎস্য দপ্তরের ২০১৩ সালের সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ জলভাগে ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাপের জাল ব্যবহারের বিধান রয়েছে।
সরকারি নিয়মে বলা হয়েছে:
মনোফিলামেন্ট গিল নেটের ফাঁস ৯০ মিলিমিটারের কম হলে তা দিয়ে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ।
অন্যান্য ধরনের জালের ক্ষেত্রে ৪০ মিলিমিটারের কম ফাঁস ব্যবহার করে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ।
২৩ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের ইলিশ পরিবহণ, বিক্রি, বাজারজাত এবং নিজের কাছে রাখা নিষিদ্ধ।
এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হল ছোট ইলিশকে রক্ষা করা এবং মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বজায় রাখা।
ইলিশ মাছ প্রজননের জন্য নদীর দিকে আসে। বিশেষ করে বর্ষা ও নির্দিষ্ট প্রজনন মরশুমে নদীর মিষ্টি পানির পরিবেশে ইলিশের প্রজনন ঘটে।
এই সময় অতিরিক্ত মাছ ধরা হলে প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা কমে যেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন ইলিশের জন্ম ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই উপযুক্ত জালের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরার উপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করলে শুধু ছোট ইলিশ নয়, অন্যান্য ছোট জলজ প্রাণীও আটকে যেতে পারে। এর ফলে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়লে ভবিষ্যতের মাছের জোগান কমতে পারে। এর প্রভাব পড়ে মৎস্যজীবীদের জীবিকা এবং বাজারে ইলিশের সরবরাহের উপর।
ইলিশ মাছ ধরেই বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু যদি ছোট মাছ নির্বিচারে ধরে ফেলা হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে বড় ইলিশের সংখ্যা কমে যেতে পারে।
সেই কারণে সঠিক মাপের জাল ব্যবহার করা মৎস্যজীবীদের নিজেদের স্বার্থেও জরুরি। আজ কিছু ছোট মাছ ছেড়ে দেওয়া মানে আগামী দিনে আরও বেশি পরিণত ইলিশ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করা।
ইলিশ সংরক্ষণের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিভিন্ন সময়ে মাছ ধরার উপর বিধিনিষেধ জারি করেছে। নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, জাটকা সংরক্ষণ এবং নিষিদ্ধ মাপের জাল ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই নিয়ম অমান্য করে মাছ ধরলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তাই প্রত্যেক মৎস্যজীবীর উচিত স্থানীয় মৎস্য দপ্তরের নির্দেশিকা মেনে চলা।
ইলিশ মাছের উৎপাদন বজায় রাখতে শুধু বেশি মাছ ধরলেই হবে না, বরং মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার এবং বেড়ে ওঠার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক মাপের জাল ব্যবহার, ছোট ইলিশ সংরক্ষণ এবং প্রজনন মরশুমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার মাধ্যমেই ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, ইলিশ আমাদের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। এই সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়, মৎস্যজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষেরও। আজ সচেতন হলে আগামী প্রজন্মও পাতে পাবে সুস্বাদু বাংলার ইলিশ।