নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: যুদ্ধ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে এবার একজোট হলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্দর শ্রমিকরা। অস্ত্র পরিবহণ এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে বাণিজ্যিক বন্দর ব্যবহার বন্ধের দাবিতে ৩০ অক্টোবর শুক্রবার আন্তর্জাতিক ধর্মঘট ও কর্মবিরতিতে শামিল হন ২২টি দেশের শ্রমিক সংগঠন। আয়োজকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ মহাদেশের ১১৩টি বন্দরে এই কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়ে। ২৫টিরও বেশি শ্রমিক সংগঠন এই আন্দোলনে অংশ নেয়। গাজায় যুদ্ধ, সামরিক সংঘাত এবং যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষ ও সমুদ্রকর্মীদের প্রাণহানির প্রতিবাদই ছিল এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
‘ডকওয়ার্কার্স ডু নট ওয়ার্ক ফর ওয়ার’—অর্থাৎ যুদ্ধের জন্য কাজ করবেন না বন্দর শ্রমিকরা, এই স্লোগানকে সামনে রেখে সংগঠিত হয় আন্তর্জাতিক কর্মসূচি। শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য, বাণিজ্যিক বন্দরকে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণের কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়। বন্দর ও জাহাজশ্রমিকদের শ্রম যেন যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহার না হয়, সেই দাবিই সামনে এসেছে আন্দোলনে।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনগুলির সমন্বয়ে এই কর্মসূচি ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া-সহ পাঁচ মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২৫টিরও বেশি ট্রেড ইউনিয়ন এই উদ্যোগে সমর্থন জানায়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১৩টি বন্দরে বিভিন্ন মাত্রায় ধর্মঘট, কর্মবিরতি, বিক্ষোভ এবং পিকেটিংয়ের আয়োজন করা হয়।
তবে সব বন্দরে একই সময়ের জন্য সম্পূর্ণ কাজ বন্ধ ছিল না। কোথাও ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘট, কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের কর্মবিরতি, আবার কোথাও বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। ফলে ১১৩টি বন্দরের সবকটিতে সম্পূর্ণভাবে বন্দর পরিষেবা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল—এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রেক্ষাপট গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এবং সেখানে সাধারণ মানুষের উপর যুদ্ধের প্রভাব। শ্রমিক সংগঠনগুলির অভিযোগ, বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক বন্দর ও সামুদ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়। সেই সরবরাহ ব্যবস্থায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।
তাঁদের দাবি, বন্দরগুলিকে যুদ্ধের রসদ সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। বন্দর শ্রমিকদের বক্তব্য, জাহাজে অস্ত্র ওঠানো, পণ্য পরিবহণ এবং সামুদ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার কাজে তাঁদের শ্রম গুরুত্বপূর্ণ। তাই যুদ্ধের জন্য সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাঁরা প্রতিবাদ জানাতে চান।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আন্তর্জাতিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান দাবি ছিল প্যালেস্টাইনের মানুষের উপর সহিংসতার অবসান এবং সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরোধিতা।
ধর্মঘটের প্রভাব পড়ে ইউরোপের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে। গ্রিসের পিরেয়াস বন্দরে শ্রমিকদের কর্মবিরতির ফলে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ ব্যাহত হয়। ফেরি পরিষেবাতেও প্রভাব পড়ে। ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, তুরস্ক এবং মরক্কোর বিভিন্ন বন্দরেও প্রতিবাদ ও কর্মবিরতির কর্মসূচি পালিত হয়।
জার্মানির হামবুর্গ, স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া, ফ্রান্সের লে আভর, ইতালির জেনোয়া এবং মরক্কোর ট্যাঞ্জার মেডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলিও এই আন্তর্জাতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিসের পিরেয়াস বন্দরে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মবিরতিতে অংশ নেন। সেখানে পণ্য পরিবহণের কাজ থমকে যাওয়ার পাশাপাশি দ্বীপগুলির সঙ্গে ফেরি যোগাযোগেও বিঘ্ন ঘটে। তবে প্রতিটি বন্দরে ধর্মঘটের প্রভাব একরকম ছিল না।
এই আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে ভারতের শ্রমিক সংগঠনগুলিও সমর্থন জানায়। রয়টার্সের আগাম প্রতিবেদনে ভারতের নভা শেভা বন্দরের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। আল জাজিরার প্রতিবেদনেও ভারতের বন্দর শ্রমিক সংগঠনগুলির অংশগ্রহণের কথা উঠে এসেছে।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ভারতীয় প্রতিনিধিরা পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রায় ১৫ জন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং আরও কয়েকজন সমুদ্রে আটকে পড়েছেন। এই দাবি শ্রমিক প্রতিনিধিদের বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
এই আন্দোলনের সঙ্গে শুধু যুদ্ধ ও অস্ত্র পরিবহণ বন্ধের দাবি যুক্ত ছিল না। শ্রমিকরা তাঁদের কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন সমস্যাও সামনে আনেন। বেতন বৃদ্ধি, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজে চিকিৎসকের ব্যবস্থা করার দাবি তোলেন তাঁরা।
সমুদ্রপথে কাজ করা নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জাহাজে হামলা, নাবিকদের আহত হওয়া এবং প্রাণহানির ঘটনা শ্রমিক সংগঠনগুলির কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। তাঁদের দাবি, বিপজ্জনক সামুদ্রিক পথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে গ্রিসের শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপসাগরীয় অঞ্চল ও কৃষ্ণসাগরে জাহাজে হামলা এবং নাবিকদের হতাহতের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক এই কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিক সংগঠনগুলি বন্দর ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, বন্দর মূলত বাণিজ্য, মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহণ এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগের কেন্দ্র। সেই পরিকাঠামোকে যুদ্ধের অস্ত্র সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হলে শ্রমিকদেরও তার দায়ের মধ্যে টেনে আনা হয়।
এই আন্দোলনের পিছনে রয়েছে ২০২৬ সালের মে মাসে ইস্তানবুলে বিভিন্ন দেশের বন্দর শ্রমিক সংগঠনগুলির বৈঠক এবং সেখানে গৃহীত ঘোষণা। সেই ঘোষণায় বাণিজ্যিক বন্দরকে যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র, গোলাবারুদ, সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা পরিবহণের কাজে ব্যবহার না করার দাবি জানানো হয়েছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্দর শ্রমিকদের এই সমন্বিত কর্মসূচি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ বন্দর ও সামুদ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ক্ষেত্রের শ্রমিকরা একযোগে কর্মবিরতি পালন করলে সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এই ধর্মঘটের ফলে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য সম্পূর্ণ থমকে গিয়েছে, এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই। বিভিন্ন বন্দরে কর্মসূচির ধরন ও সময় আলাদা হওয়ায় প্রভাবও ছিল ভিন্ন। কোথাও পণ্য ওঠানো-নামানো বন্ধ হয়েছে, কোথাও ফেরি পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে, আবার কোথাও প্রতিবাদ মিছিল ও পিকেটিং হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২২টি দেশের ১১৩টি বন্দরে বন্দর শ্রমিকদের এই আন্তর্জাতিক কর্মসূচি যুদ্ধ, অস্ত্র সরবরাহ এবং সমুদ্রপথে কর্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। শ্রমিকদের বার্তা স্পষ্ট—বন্দরকে মানুষের প্রয়োজন মেটানোর কাজে ব্যবহার করা হোক, যুদ্ধের রসদ সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে নয়।