নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: পঞ্চায়েত স্তরে সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং গ্রামীণ এলাকার উন্নয়নে যাঁরা সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও দাবিদাওয়াকে সামনে রেখে শিলিগুড়ির দীনবন্ধু মঞ্চে আয়োজিত হল ‘উত্তরবঙ্গ সমাবেশ–২০২৬’। সারা বাংলা গ্রামীণ সম্পদ কর্মী সংগঠন (SBGSKS)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পঞ্চায়েত দফতরের প্রতিমন্ত্রী সন্তনু প্রামাণিক-সহ অন্যান্য নেতৃত্ব ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
গ্রামীণ সম্পদ কর্মীরা পঞ্চায়েত স্তরে সরকারি পরিষেবা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতা, কর্মক্ষেত্রের সমস্যা, প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা এবং দীর্ঘদিনের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনার পরিসর তৈরি করাই ছিল এই সমাবেশের অন্যতম উদ্দেশ্য। সম্মেলনে গ্রামীণ উন্নয়নের কাজ আরও দ্রুত করার পাশাপাশি কর্মীদের দায়িত্ব ও তাঁদের সুযোগ-সুবিধা নিয়েও আলোচনা হয়।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ গ্রামীণ সম্পদ কর্মীদের সম্মানী বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গ্রাম পঞ্চায়েতের কর্মীদের সম্মানী বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে তা আরও বাড়ানো যায় কি না, সেই সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
তবে সম্মানী বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মীদের নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার উপরও জোর দেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, সরকারি প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে এবং সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। সরকারের সঙ্গে কর্মীদের সমন্বয় বজায় থাকলে গ্রামীণ উন্নয়নের কাজ আরও কার্যকর করা সম্ভব।
সমাবেশে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। পঞ্চায়েতমন্ত্রী আধিকারিক ও মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মীদের প্রকল্পের কাজ দ্রুত এবং মসৃণভাবে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও রকম অযথা বিলম্ব যাতে না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জিরামজি প্রকল্পের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে বিভিন্ন গ্রামে একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ করার পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকার পরিকাঠামো এবং পরিষেবার উন্নয়নে গতি আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
সমাবেশে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। দিলীপ ঘোষের বক্তব্য, গ্রাম পঞ্চায়েতের নিজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় স্তরে নানা কাজকর্ম ও কার্যক্রমের মাধ্যমে পঞ্চায়েতের নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানো গেলে উন্নয়নমূলক কাজের আর্থিক ভিত্তিও আরও মজবুত হবে।
গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি পঞ্চায়েতগুলিকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পঞ্চায়েতের নিজস্ব আয় বাড়লে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করার ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে।
গ্রামীণ সম্পদ কর্মীরা সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রকল্পের সুবিধা কারা পাচ্ছেন, কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে, সাধারণ মানুষ কী ধরনের অসুবিধার মুখোমুখি হচ্ছেন—এই বিষয়গুলি মাঠপর্যায়ে তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উঠে আসে।
সমাবেশে কর্মীদের উদ্বেগ ও সমস্যাগুলিকে গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। একইসঙ্গে নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। কর্মীদের অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনের পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় তৈরি হলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হতে পারে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
সমাবেশে আবাস যোজনার আবেদন নিয়েও বক্তব্য রাখেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর দাবি, এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫৫ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু আবেদন ভুয়ো বলে তাঁর দাবি। যাচাইয়ের পর সেগুলি বাদ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় কর্মীসংকট দূর করতে নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন মন্ত্রী। পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত কর্মী ও আধিকারিক থাকা জরুরি, কারণ গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের ভূমিকা রয়েছে।
অতীতে মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মীদের সঙ্গে মন্ত্রী ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল বলে সংগঠনের বক্তব্য। বর্তমান সরকারের তরফে সেই দূরত্ব কমিয়ে কর্মীদের কাছ থেকে সরাসরি তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা শোনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে জানানো হয়েছে।
এই ধরনের সমাবেশের মাধ্যমে কর্মীরা নিজেদের অভাব-অভিযোগ ও কাজের বাস্তব পরিস্থিতি সরাসরি নেতৃত্বের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পান। প্রশাসনের পক্ষেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোথায় সমস্যা হচ্ছে, তা বোঝা সহজ হয়। ফলে কর্মীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
‘উত্তরবঙ্গ সমাবেশ–২০২৬’-এ গ্রামীণ সম্পদ কর্মীদের সম্মানী, দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রের সমস্যা, নিয়োগ এবং পঞ্চায়েতের আর্থিক সক্ষমতা—একাধিক বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। মন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে কর্মীদের উদ্বেগ বিবেচনার আশ্বাস, অন্যদিকে সরকারি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব পালনের বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
সব মিলিয়ে, শিলিগুড়ির দীনবন্ধু মঞ্চের এই সম্মেলন গ্রামীণ সম্পদ কর্মীদের কাজ ও দাবিদাওয়াকে সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে সম্মেলনে দেওয়া আশ্বাসগুলির কতটা বাস্তবায়ন হয়, বিশেষ করে সম্মানী বৃদ্ধি, নিয়োগ এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের উন্নয়নমূলক কাজ কতটা এগোয়, সেদিকেই নজর থাকবে।