নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গি সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান ঘিরে উদ্বেগের আবহ। রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার এবং মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের বলে দাবি করা হচ্ছে। আক্রান্তের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ। এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গি প্রতিরোধে রাজ্য সরকারের ভূমিকা, স্বাস্থ্য দপ্তরের তৎপরতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, প্রতি বছর ডেঙ্গির প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর প্রশাসনিক বৈঠক ও আশ্বাস সামনে এলেও সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঘটনা রুখতে বাস্তবে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে জমা জল ও মশার বংশবৃদ্ধির কারণে ডেঙ্গির সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গি সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই প্রায় ১৩ হাজার আক্রান্ত এবং ১৫ জনের মৃত্যুর পরিসংখ্যান সামনে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যার নিরিখে মুর্শিদাবাদ রয়েছে শীর্ষে। তবে এই সংখ্যাগুলির নির্দিষ্ট সময়কাল, সরকারি স্বাস্থ্য দপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন এবং মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা জরুরি।
ডেঙ্গির মতো মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতি, নিয়মিত নজরদারি, জমা জল অপসারণ এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও আলোচনা জরুরি।
ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য সরকারের জবাবদিহি দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, প্রতি বছর ডেঙ্গির প্রকোপ দেখা দেয়, মানুষ আক্রান্ত হন, মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসে। এরপর প্রশাসনিক বৈঠক, পর্যালোচনা এবং নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে কী কার্যকর পদক্ষেপ করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তাঁর প্রশ্ন, ডেঙ্গি প্রতিরোধে সরকার ঠিক কী ব্যবস্থা নিয়েছে? কোন কোন এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে? মশার বংশবৃদ্ধি রুখতে জমা জল পরিষ্কার, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ এবং মশা নিধনের কাজ কতটা নিয়মিত হচ্ছে? আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলিতে কী ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে?
অধীররঞ্জনের বক্তব্যের মূল সুর, মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে কোনও ধরনের অবহেলার সুযোগ নেই। শুধু প্রচার বা আশ্বাস নয়, ডেঙ্গি মোকাবিলায় বাস্তব ক্ষেত্রে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে, তার হিসাবও সামনে আসা দরকার।
ডেঙ্গি মোকাবিলায় প্রশাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল সংক্রমণের উৎস চিহ্নিত করা এবং মশার বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা জল, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণস্থল, নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যা এবং দীর্ঘদিন পরিষ্কার না হওয়া জলাধার এডিস মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে পুরসভা, পঞ্চায়েত, স্বাস্থ্য দপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত এলাকা পরিদর্শন, জমা জল অপসারণ, লার্ভা শনাক্তকরণ, সচেতনতামূলক প্রচার এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
অধীররঞ্জনের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তাই শুধু কতগুলি বৈঠক হয়েছে বা কতটা প্রচার চালানো হয়েছে, তা নয়—কোন এলাকায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তার ফলে সংক্রমণ কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সেই তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রকাশিত দাবিতে মুর্শিদাবাদকে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যার নিরিখে রাজ্যের শীর্ষে রাখা হয়েছে। এই তথ্য সঠিক হলে জেলাটিতে সংক্রমণের পরিস্থিতি, আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কোন কোন ব্লক বা এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে মশার বংশবৃদ্ধির পরিস্থিতি কেমন এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ করা প্রয়োজন।
তবে জেলা-ভিত্তিক আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হলেই সেখানে প্রশাসনিক গাফিলতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। সংক্রমণের প্রকৃত কারণ বুঝতে আক্রান্তের হার, পরীক্ষা, নজরদারি এবং স্থানীয় পরিস্থিতি একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ডেঙ্গি মোকাবিলায় সচেতনতা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি প্রশাসনের ধারাবাহিক পদক্ষেপ। বাসিন্দাদের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও জল জমতে না দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকেও নিয়মিত নজরদারি চালাতে হয়। পাশাপাশি জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
অধীররঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে এসেছে মূলত এই জবাবদিহির প্রশ্নই। রাজ্য সরকার ডেঙ্গি প্রতিরোধে কী পরিকল্পনা করেছে, সেই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে এবং সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে আর কী জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—তার স্পষ্ট উত্তর দাবি করছেন তিনি।
এখন নজর থাকবে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান, জেলা-ভিত্তিক পরিস্থিতি এবং সরকারের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার উপর। ডেঙ্গি মোকাবিলায় প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও চিকিৎসা পরিষেবার বাস্তব চিত্র সামনে আসা জরুরি।