বারুইপুর: চিকিৎসকের পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা এবং ভুয়ো ডিগ্রি ব্যবহার করে চিকিৎসা করার অভিযোগে ফের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের বেতবেড়িয়া এলাকায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ধৃত ব্যক্তির নাম রুল আমিন খান, যিনি আর এ খান নামেও পরিচিত বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, নিজেকে কলকাতার ট্রপিকাল হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে এবং প্রেসক্রিপশনে এমবিবিএস ও এমডি ডিগ্রি ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে রোগী দেখছিলেন তিনি। শুধু বেতবেড়িয়াতেই নয়, মল্লিকপুরেও একটি ঘর ভাড়া নিয়ে আলাদা চেম্বার চালানোর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বারুইপুরের বেতবেড়িয়া রামকৃষ্ণপল্লীর বাসিন্দা রিপন হাওলাদার তাঁর এক পরিচিত মহিলাকে চিকিৎসার জন্য অভিযুক্তের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। অভিযোগ, ওই ব্যক্তি নিজেকে কলকাতার ট্রপিকাল হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দিতেন। রোগীদের বিশ্বাস অর্জন করতে নিজের নামের পাশে এমবিবিএস এবং এমডি-র মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিগ্রি ব্যবহার করতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
চিকিৎসা করানোর পর ওই মহিলা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ করেছেন রিপন হাওলাদার। তাঁর দাবি, অভিযুক্তের ভুল চিকিৎসার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগের বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনার পর অভিযুক্তের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় রিপন হাওলাদারের। এরপর তিনি সরাসরি কলকাতার ট্রপিকাল হাসপাতালে যোগাযোগ করে খোঁজখবর নেন। অভিযোগ, সেখান থেকেই তিনি জানতে পারেন, রুল আমিন খান নামে কোনও চিকিৎসক ওই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত নন।
এই তথ্য জানার পরই বিষয়টি নিয়ে আরও সন্দেহ বাড়ে তাঁর। একজন চিকিৎসক যদি কোনও নামী হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত থাকার মিথ্যা পরিচয় দেন এবং ভুয়ো ডিগ্রি ব্যবহার করে রোগী দেখেন, তা হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃত চিকিৎসক ও প্রতারকের মধ্যে পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই আশঙ্কা থেকেই শেষ পর্যন্ত পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রিপনবাবু।
অভিযোগের ভিত্তিতে বারুইপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন রিপন হাওলাদার। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। এরপরই অভিযুক্ত রুল আমিন খানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ঠিক কতদিন ধরে অভিযুক্ত এইভাবে চিকিৎসার নামে প্রতারণা চালাচ্ছিলেন। তাঁর ব্যবহৃত প্রেসক্রিপশন প্যাড, চিকিৎসার নথিপত্র এবং ডিগ্রি সংক্রান্ত দাবির সত্যতা যাচাই করার বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি, এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত রয়েছেন কি না, অথবা অন্য কোনও জায়গায় একইভাবে চেম্বার চালানো হচ্ছিল কি না, তা নিয়েও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বেতবেড়িয়া এলাকায় চেম্বার চালানোর পাশাপাশি মল্লিকপুরেও একটি ঘর ভাড়া নিয়ে রোগী দেখতেন অভিযুক্ত। একাধিক জায়গায় চেম্বার চালানোর ফলে তাঁর কাছে কতজন রোগী চিকিৎসা করিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ।
বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কাছে চিকিৎসা করিয়েছেন, তাঁদের চিকিৎসার নথি এবং শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে কতজন রোগী তাঁর কাছে চিকিৎসা করিয়েছেন বা অন্য কোনও রোগীর ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত তথ্য সামনে আসেনি।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভুয়ো চিকিৎসক, জাল ডিগ্রি এবং চিকিৎসকের পরিচয় দিয়ে প্রতারণার অভিযোগ মাঝেমধ্যেই সামনে আসে। চিকিৎসা মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একজন অনভিজ্ঞ বা অযোগ্য ব্যক্তি চিকিৎসার নামে ভুল ওষুধ দিলে কিংবা ভুল চিকিৎসা করলে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি প্রাণঘাতীও হয়ে উঠতে পারে।
চিকিৎসকের পরিচয় যাচাই না করে শুধুমাত্র হাসপাতালের নাম, চেম্বারের সাইনবোর্ড কিংবা প্রেসক্রিপশনে লেখা ডিগ্রি দেখে বিশ্বাস করা ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর, সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কাউন্সিলের নথি এবং হাসপাতালের সঙ্গে তাঁর পেশাগত সম্পর্ক সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসা করানোর আগে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর যাচাই করুন, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হন এবং কোনও হাসপাতালের চিকিৎসক বলে দাবি করলে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি, প্রেসক্রিপশন ও ওষুধের বিবরণও যত্ন করে সংরক্ষণ করুন।
কোনও চিকিৎসকের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য দপ্তর, মেডিক্যাল কাউন্সিল অথবা পুলিশের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। ভুল চিকিৎসার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত অন্য কোনও যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বারুইপুরের এই ঘটনায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই সামনে আসবে। তবে ঘটনাটি আরও একবার স্পষ্ট করে দিল, চিকিৎসার ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সঠিক পরিচয় যাচাই কতটা জরুরি। মানুষের অসহায়তা এবং বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে কেউ যাতে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করতে না পারে, তার জন্য প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সতর্কতাও অত্যন্ত প্রয়োজন।