নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেলেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে ফের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হলেন তিনি। রবিবার, ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার ভোটের ফলাফল ঘোষণা করে ব্রাজিলের জাতীয় নির্বাচন কর্তৃপক্ষ। এই জয়ের ফলে ব্রাজিলের ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার নজির গড়লেন লুলা। তাঁর এই জয়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রক্ষণশীল শক্তিগুলির রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ব্রাজিলের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, লুলা দা সিলভা পেয়েছেন ৬ কোটি ৪২ লক্ষ ৫৬ হাজার ২৩২টি ভোট, যা বৈধ ভোটের ৫১.৭৯ শতাংশ। অন্যদিকে, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৫ কোটি ৯৮ লক্ষ ২৬ হাজার ৪১টি ভোট, অর্থাৎ বৈধ ভোটের ৪৮.২১ শতাংশ। দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল যথেষ্ট তীব্র। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয় নিশ্চিত করেন লুলা।
এই নির্বাচনের ফলাফল ব্রাজিলের রাজনৈতিক মেরুকরণের ছবিও স্পষ্ট করেছে। একদিকে লুলার নেতৃত্বাধীন বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক শিবির, অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারোর নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল ও ডানপন্থী শিবির—দুই পক্ষের মধ্যে লড়াইয়ে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, সামাজিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল।
এই নির্বাচনে ফ্লাভিও বলসোনারোর পরাজয়কে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলির জন্য ধাক্কা হিসেবে দেখছেন। ফ্লাভিও বলসোনারো প্রাক্তন ব্রাজিলীয় রাষ্ট্রপতি জাইর বলসোনারোর ছেলে এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও রক্ষণশীল শিবিরের সঙ্গে যুক্ত। নির্বাচনী প্রচারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
লুলা তাঁর প্রচারে ব্রাজিলের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে, ফ্লাভিও বলসোনারো নিরাপত্তা ও রক্ষণশীল নীতির উপর জোর দিয়েছিলেন। ফলে এই নির্বাচন শুধু দুই প্রার্থীর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই ছিল না, বরং ব্রাজিল কোন ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথ অনুসরণ করবে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছিল।
তবে লুলার জয়কে সরাসরি সাম্রাজ্যবাদের অবসান হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেয়ে বলা যায়, ব্রাজিলের ভোটাররা নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সম্পর্কে নিজেদের মতামত জানিয়েছেন। এই ফলাফল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে নতুন সরকারের নীতি ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের উপর।
লুলা দা সিলভার রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে গড়ে উঠেছে। ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের গারানিউন্সে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জীবনের প্রথম দিকে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন এবং পরে ধাতুশিল্পের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৮০ সালে ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টি বা পার্টিদো দোস ত্রাবালহাদোরেস (PT) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। শ্রমিকদের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নের দাবি তাঁকে দেশের বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ করে তোলে।
২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি ছিলেন লুলা। ২০২৩ সালে আবার রাষ্ট্রপতি পদে ফিরে আসেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে এবার তাঁর চতুর্থ রাষ্ট্রপতি মেয়াদ নিশ্চিত হল।
লুলার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দারিদ্র্য হ্রাস, শ্রমিকদের অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নতুন মেয়াদেও এই বিষয়গুলি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। নির্বাচনী প্রচারে সামাজিক সহায়তা সম্প্রসারণ, পরিবারের আর্থিক চাপ কমানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মতো প্রতিশ্রুতি উঠে এসেছে।
তবে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ব্রাজিলের জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মতো সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে তাঁকে। সংসদে রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবও সরকারের নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই নির্বাচনী জয়ের পর লুলার সামনে প্রধান কাজ হবে রাজনৈতিক সমর্থনকে বাস্তব প্রশাসনিক পদক্ষেপে রূপান্তর করা। <Cite refs={["turn627958news11","turn627958search1"]}/>
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জলবায়ু নীতি, কৃষি, জ্বালানি এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লুলার নেতৃত্বে ব্রাজিল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার উপর গুরুত্ব দিতে পারে।
বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক শুল্কনীতি এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সহযোগিতা নতুন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, আমাজন অরণ্য রক্ষা এবং উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্নও ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত।
লুলার জয়কে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় গণতন্ত্র, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলিও উঠে এসেছে।
লুলার এই জয় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করল। প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয় দফায় প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া ব্রাজিলের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফায় প্রায় ১২ কোটি ৮২ লক্ষ ভোটার ভোট দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ব্রাজিলে লুলা দা সিলভার পুনর্নির্বাচন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বামপন্থী রাজনীতির ধারাবাহিকতা, সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুই তাঁর নতুন মেয়াদের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে চলেছে।
ব্রাজিলের ভোটারদের রায়ে ফের রাষ্ট্রপতি পদে ফিরলেন লুলা দা সিলভা। এখন নজর, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক বিভাজন মোকাবিলায় কতটা অগ্রগতি আনতে পারেন।