নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: শীতের মরশুম আসতে না আসতেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি। ভালো ফলন এবং লাভের আশায় মাঠে নেমে পড়েছেন কৃষকরা। কোথাও তৈরি হচ্ছে বীজতলা, কোথাও আবার চলছে জমি প্রস্তুতির কাজ। শীতকালীন সবজির মধ্যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, লঙ্কা, মুলো, পালং শাক, ধনেপাতা-সহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষের পরিকল্পনা করছেন চাষিরা। আর সেই চাষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল উন্নত মানের সবজির চারা তৈরি।
শীতকালীন সবজি চাষে ভালো ফলন পেতে হলে প্রথম থেকেই বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বীজ নির্বাচন, বীজতলা তৈরি, সঠিক সময়ে বীজ বপন এবং চারার পরিচর্যার উপর নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে ফসলের উৎপাদন। তাই কৃষকরা এখন থেকেই চারা তৈরির কাজে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কীভাবে তৈরি করবেন শীতকালীন সবজির চারা?
প্রথমে চারা তৈরির জন্য উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করতে হবে। এমন জায়গা বেছে নেওয়া ভালো যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় এবং জল জমে থাকার আশঙ্কা কম থাকে। এরপর মাটি ভালোভাবে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। মাটির সঙ্গে পচা গোবর সার বা ভালোভাবে তৈরি জৈব সার মিশিয়ে বীজতলা তৈরি করা যেতে পারে। এতে চারার প্রাথমিক বৃদ্ধিতে সুবিধা হয়।
ফুলকপি ও বাঁধাকপিরকৃষকের উন্নয়ন ও আর্থিক সুরক্ষায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিলো পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধির ৬০০০ টাকার পাশাপাশি রাজ্য সরকারের তরফে অতিরিক্ত ৩০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা করা হবে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বিলে ৪ লক্ষ কৃষককে প্রতি ইউনিটে ২ টাকা ভর্তুকি, জমির পরিমাণ অনুযায়ী যোগ্য কৃষকদের বছরে ৪০০০ থেকে ১২০০০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়াও, ধান চাষিরা ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের পাশাপাশি কুইন্ট্যাল প্রতি অতিরিক্ত ২০০ টাকা পাবেন।
কৃষকের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য, কৃষির প্রসার এবং কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মতো সবজির ক্ষেত্রে বীজতলায় প্রথমে বীজ বপন করে চারা তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে চারাগুলি কিছুটা বড় হলে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। একইভাবে টমেটো, বেগুন ও লঙ্কার চারাও বীজতলায় তৈরি করা যায়। তবে প্রতিটি সবজির জন্য উপযুক্ত জাত এবং বীজ বপনের সময় আলাদা হতে পারে।
চারার পরিচর্যায় বিশেষ নজর
শুধু বীজ বপন করলেই হবে না, চারাগুলির নিয়মিত পরিচর্যাও অত্যন্ত জরুরি। বীজ বপনের পর মাটিতে হালকা আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে। অতিরিক্ত জল দিলে বীজ পচে যেতে পারে এবং চারার গোড়ায় রোগ দেখা দিতে পারে। আবার মাটি অতিরিক্ত শুকিয়ে গেলেও বীজের অঙ্কুরোদ্গম ব্যাহত হয়।
চারা গজানোর পর প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা জল দিতে হবে। পাশাপাশি আগাছা পরিষ্কার রাখা এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে চারাকে রক্ষা করাও জরুরি। বীজতলায় অতিরিক্ত ঘন করে চারা তৈরি না করাই ভালো। এতে চারাগুলি পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পায় এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে।
রোগ ও পোকামাকড় থেকে রক্ষার ব্যবস্থা
শীতকালীন সবজির চারা তৈরির সময় একটি বড় সমস্যা হল বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজনিত রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ। বিশেষ করে অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং জল জমে থাকলে চারার গোড়া পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বীজতলায় জল নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা রাখতে হবে। আক্রান্ত চারা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজন হলে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত জৈব বা রাসায়নিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
কৃষকদের জন্য বাড়তি সতর্কতা
চারা মূল জমিতে রোপণের আগে জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করতে হবে। জমির মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করা উচিত। চারা যখন যথেষ্ট শক্তিশালী হবে এবং কয়েকটি প্রকৃত পাতা বের হবে, তখন আবহাওয়া ও সবজির জাত অনুযায়ী মূল জমিতে রোপণ করা যেতে পারে। রোপণের পরপরই হালকা সেচ দিলে চারার মাটির সঙ্গে শিকড়ের সংযোগ ভালো হয়।
বাড়ির ছাদেও তৈরি করা যায় শীতকালীন সবজির চারা
শুধু বড় কৃষিজমি নয়, বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা উঠোনেও ছোট পরিসরে শীতকালীন সবজির চারা তৈরি করা সম্ভব। এর জন্য ছোট ট্রে, টব অথবা উপযুক্ত পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। মাটির সঙ্গে জৈব সার মিশিয়ে বীজ বপন করলে বাড়িতেই তৈরি করা সম্ভব স্বাস্থ্যকর সবজির চারা। পরবর্তীতে টব বা বড় পাত্রে সেই চারা রোপণ করে নিজের বাড়িতেই শীতকালীন সবজি উৎপাদন করা যায়।
সব মিলিয়ে, শীতকালীন সবজি চাষের ক্ষেত্রে চারা তৈরির পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই সঠিক পদ্ধতি মেনে চারা তৈরি করতে পারলে পরবর্তী সময়ে ভালো ফলনের সম্ভাবনা বাড়ে। তাই শীতের মরশুমকে সামনে রেখে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকরা। সঠিক বীজ নির্বাচন, পরিচর্যা এবং সময়মতো চারা রোপণের মাধ্যমে এই মরশুমে ভালো উৎপাদন ও আর্থিক লাভের আশায় রয়েছেন তাঁরা।