নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: শরীর সুস্থ রাখতে এবং পেশির গঠন মজবুত করতে প্রোটিনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রোটিনের অন্যতম জনপ্রিয় উৎস হল মুরগির মাংস, বিশেষ করে চিকেন ব্রেস্ট বা মুরগির বুকের মাংস। জিমে শরীরচর্চা করেন এমন মানুষ থেকে শুরু করে ওজন কমাতে ইচ্ছুক অনেকেই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় চিকেন ব্রেস্ট রাখেন। কিন্তু একটি মুরগির বুকের মাংস থেকে ঠিক কতটা প্রোটিন পাওয়া যায়? রান্নার আগে ও পরে কি প্রোটিনের পরিমাণ বদলে যায়? এই খাবার কি সত্যিই পেশি গঠনে সাহায্য করে?
পুষ্টিবিদদের দেওয়া সাধারণ পুষ্টিগত হিসাব অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম রান্না করা, চামড়া ছাড়া মুরগির বুকের মাংসে প্রায় ৩০–৩১ গ্রাম প্রোটিন থাকে। অন্যদিকে, ১০০ গ্রাম কাঁচা চিকেন ব্রেস্টে সাধারণত প্রায় ২২–২৪ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়। অর্থাৎ মাংসের ওজন, রান্নার পদ্ধতি এবং জলীয় উপাদানের উপর নির্ভর করে প্রোটিনের হিসাব কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
একটি সম্পূর্ণ মুরগির বুকের মাংসের ওজন নির্দিষ্ট নয়। মুরগির আকার এবং মাংসের অংশ অনুযায়ী এর ওজন কমবেশি হয়। তাই একটি চিকেন ব্রেস্টে কতটা প্রোটিন রয়েছে, তা নির্ভর করবে সেটির প্রকৃত ওজনের উপর।
আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী—
| রান্না করা চিকেন ব্রেস্টের ওজন | প্রোটিনের পরিমাণ |
|---|---|
| ৫০ গ্রাম | ১৫–১৬ গ্রাম |
| ১০০ গ্রাম | ৩০–৩১ গ্রাম |
| ১৫০ গ্রাম | ৪৫–৪৭ গ্রাম |
| ২০০ গ্রাম | ৬০–৬২ গ্রাম |
অর্থাৎ একটি মাঝারি আকারের চিকেন ব্রেস্টের রান্না করা মাংসের ওজন যদি ১৫০ গ্রাম হয়, তাহলে সেখান থেকে প্রায় ৪৫ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যেতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, রান্না করার সময় মুরগির মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। রান্নার সময় মাংসের মধ্যে থাকা জলীয় অংশের অনেকটাই বেরিয়ে যায়। ফলে মাংসের ওজন কমে যায় এবং প্রতি ১০০ গ্রামে প্রোটিনের ঘনত্ব বেড়ে যায়।
উদাহরণ হিসেবে, ১০০ গ্রাম কাঁচা চিকেন ব্রেস্ট রান্নার পরে ওজন কমে প্রায় ৭০–৭৫ গ্রাম হতে পারে। কিন্তু রান্নার ফলে প্রোটিনের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায় না। মূলত জল কমে যাওয়ার কারণেই রান্না করা মাংসের প্রতি ১০০ গ্রামে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি দেখা যায়।
যাঁরা নিয়মিত জিম করেন বা শরীরচর্চা করেন, তাঁদের খাদ্যতালিকায় চিকেন ব্রেস্টের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হল এর উচ্চ প্রোটিনের পরিমাণ। মুরগির বুকের মাংসে থাকা প্রোটিন শরীরের পেশি তৈরি, ক্ষয়প্রাপ্ত পেশি মেরামত এবং শরীরের বিভিন্ন কোষের স্বাভাবিক কাজকর্মে সাহায্য করে।
চিকেন ব্রেস্টে শরীরের প্রয়োজনীয় একাধিক অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। এটি একটি সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। নিয়মিত শরীরচর্চার সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করলে পেশির বৃদ্ধি ও পুনরুদ্ধারে সাহায্য হতে পারে।
তবে শুধু চিকেন ব্রেস্ট খেলেই পেশি তৈরি হবে না। এর পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম এবং সুষম খাদ্য গ্রহণও জরুরি।
ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান এমন মানুষের কাছেও চিকেন ব্রেস্ট বেশ জনপ্রিয়। চামড়া ছাড়া মুরগির বুকের মাংসে প্রোটিন বেশি এবং তুলনামূলকভাবে চর্বি কম থাকে। ফলে এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে।
প্রোটিন হজম করতে শরীরকে তুলনামূলক বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। পাশাপাশি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সুবিধা হতে পারে। তাই সঠিক পরিমাণে চিকেন ব্রেস্ট, শাকসবজি এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার একসঙ্গে খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণের খাদ্যতালিকায় এটি রাখা যেতে পারে।
তবে ওজন কমানোর জন্য শুধু মুরগির মাংসের উপর নির্ভর করা ঠিক নয়। মোট ক্যালরি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম এবং জীবনযাপনের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রোটিন ছাড়াও মুরগির বুকের মাংসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। যেমন—
ভিটামিন বি৬: শরীরের বিপাকক্রিয়া এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজকর্মে সাহায্য করে।
ভিটামিন বি৩ বা নিয়াসিন: খাদ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
ফসফরাস: হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সেলেনিয়াম: শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে।
ফসফরাস ও অন্যান্য খনিজ: শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাহায্য করে।
চিকেন ব্রেস্টের পুষ্টিগুণ বজায় রাখতে রান্নার পদ্ধতির দিকে নজর দেওয়া দরকার। অতিরিক্ত তেল, মাখন বা ক্রিম ব্যবহার করলে খাবারের ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
তাই খাবারের তালিকায় রাখতে পারেন—
১. সেদ্ধ বা পোচ করা চিকেন ব্রেস্ট।
২. অল্প তেলে গ্রিল করা মুরগির বুকের মাংস।
৩. সবজি দিয়ে চিকেন স্যুপ।
৪. অল্প মশলা দিয়ে রান্না করা চিকেন।
৫. সালাদের সঙ্গে ছোট টুকরো করে মেশানো চিকেন ব্রেস্ট।
কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মুরগির মাংস খাওয়া উচিত নয়। খাদ্যবাহিত সংক্রমণ এড়াতে মাংস ভালোভাবে রান্না করা জরুরি।
প্রত্যেক মানুষের প্রোটিনের চাহিদা এক নয়। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং শরীরচর্চার মাত্রার উপর নির্ভর করে দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা বদলে যায়।
সাধারণভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতি কেজি শরীরের ওজনে প্রায় ০.৮ গ্রাম প্রোটিন দৈনিক গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে যাঁরা নিয়মিত ভারী শরীরচর্চা করেন, তাঁদের চাহিদা বেশি হতে পারে। কিডনির অসুখ বা বিশেষ কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলে প্রোটিনের পরিমাণ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
মুরগির বুকের মাংস প্রোটিনের একটি সহজলভ্য ও পুষ্টিকর উৎস। ১০০ গ্রাম রান্না করা, চামড়া ছাড়া চিকেন ব্রেস্ট থেকে প্রায় ৩০–৩১ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যেতে পারে। পেশি গঠন, শরীরের ক্ষয়পূরণ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের খাদ্যতালিকায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সুস্থ থাকার জন্য শুধু প্রোটিন খেলেই হবে না। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, দুধ, মাছ, বাদাম এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও রাখতে হবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চাই সুস্থ শরীর গড়ার মূল চাবিকাঠি।