নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ইলিশ মানেই বাঙালির আবেগ, বর্ষার আমেজ আর পাতে গরম ভাতের সঙ্গে রুপোলি স্বাদ। কিন্তু সেই প্রিয় ইলিশ ধরতে সমুদ্রে গিয়েও যদি খালি হাতে ফিরতে হয় মৎস্যজীবীদের, তাহলে তা শুধু মাছের বাজারের সমস্যা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উপকূলের হাজার হাজার পরিবারের জীবিকা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের ইলিশ মৎস্যশিল্পে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, মাছের প্রাপ্যতার ওঠানামা এবং নদী-সমুদ্রের পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মৎস্যজীবীদের কম ইলিশ পাওয়ার জন্য অনিয়মিত বাতাস ও উত্তাল সমুদ্রের কথা উঠে এসেছে।
প্রশ্ন উঠছে, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে কি সত্যিই ইলিশের গতিপথ বদলে যাচ্ছে? কেন কখনও সমুদ্রে ইলিশের দেখা মিলছে কম, আবার কখনও নদীতে আগের মতো ইলিশ উঠছে না? বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, ইলিশের বিচরণ ও প্রজননের সঙ্গে জলপ্রবাহ, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং নদী-সমুদ্রের পরিবেশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবে মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা যায় না। এর সঙ্গে অতিরিক্ত মাছ ধরা, নদীতে পলি জমা, দূষণ এবং মাছের চলাচলের পথে বাধার মতো বিষয়ও যুক্ত।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপ, নামখানা, রায়দিঘি এবং পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এলাকার বহু মানুষের জীবিকা মৎস্য আহরণের সঙ্গে যুক্ত। ইলিশের মরশুমে ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি দেন মৎস্যজীবীরা। জ্বালানি, খাবার, বরফ, জাল এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতিটি সমুদ্রযাত্রায় বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু প্রত্যাশিত পরিমাণে ইলিশ না মিললে সেই বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপের এক ট্রলারমালিকের অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তাল সমুদ্র ও অনিশ্চিত বাতাসের কারণে পর্যাপ্ত ইলিশ না পাওয়ায় একাধিক সমুদ্রযাত্রায় লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। পরিস্থিতির কারণে কিছু সময়ের জন্য মাছ ধরতে যাওয়াও বন্ধ রাখতে হয়।
এই পরিস্থিতি থেকেই স্পষ্ট, ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু বাজারে মাছের জোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মৎস্যজীবী পরিবারগুলির আর্থিক নিরাপত্তা, ট্রলারমালিকদের বিনিয়োগ এবং মাছ পরিবহণ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের উপার্জন।
একটি সমুদ্রযাত্রায় প্রত্যাশিত মাছ না মিললে তার ক্ষতি সামলানো কঠিন। পরপর কয়েকটি যাত্রায় লোকসান হলে ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। ফলে ইলিশের মরশুমে ভালো আয়ের আশায় থাকা বহু পরিবারকে বিকল্প জীবিকার কথা ভাবতে হয়।
ইলিশ একটি পরিযায়ী মাছ। জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে এই মাছ সমুদ্র, উপকূলবর্তী জল এবং নদীর মোহনা ও মিষ্টি জলের পরিবেশের মধ্যে চলাচল করে। প্রজননের সময় অনুকূল পরিস্থিতি পেলে ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীর দিকে আসে। ডিম ফুটে ছোট মাছ বড় হওয়ার পর তাদের জীবনচক্রের পরবর্তী পর্যায়ে আবার সমুদ্রের দিকে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
এই যাতায়াতের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, নদীর জলপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং খাদ্যের প্রাপ্যতা মাছের বিচরণ ও প্রজননকে প্রভাবিত করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই পরিবেশগত উপাদানগুলিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটলে ইলিশের চলাচল ও প্রজননের সময়সূচিতে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বঙ্গোপসাগরে ইলিশের প্রজননক্ষেত্র ও উৎপাদন অঞ্চলের পরিবর্তনের সঙ্গে জলবায়ুগত এবং মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত বিভিন্ন কারণের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে জলের লবণাক্ততা, পলি জমা, নদীর পরিবর্তিত পরিবেশ এবং মানুষের হস্তক্ষেপকে ইলিশের পরিযায়ী পথ ও প্রজননক্ষেত্রের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশের গতিপথ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা বৈজ্ঞানিকভাবে বিবেচিত একটি বিষয়। তবে কোনও নির্দিষ্ট মরশুমে পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্রে ইলিশ কম পাওয়ার একমাত্র কারণ জলবায়ু পরিবর্তন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য আরও স্থানীয় তথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন।
ইলিশের জীবনচক্রে নদী ও সমুদ্রের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু নদীর মোহনায় অতিরিক্ত পলি জমা, বাঁধ ও ব্যারাজের কারণে চলাচলে বাধা, নদীর জলপ্রবাহের পরিবর্তন এবং দূষণের মতো সমস্যাগুলি মাছের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করতে পারে।
২০২৪ সালে Frontiers in Sustainable Food Systems পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণায় হুগলি-ভাগীরথী নদীব্যবস্থায় ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার সঙ্গে একাধিক পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট সমস্যার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় নদীর মোহনায় পলি জমা, বাঁধ ও ব্যারাজ, অপরিণত মাছ ধরা, প্রজননক্ষম মাছ অতিরিক্ত আহরণ এবং দূষণের মতো বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে।
নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ও পরিবেশ বদলে গেলে ইলিশের পক্ষে উপযুক্ত প্রজননক্ষেত্রে পৌঁছনো কঠিন হতে পারে। আবার ছোট ইলিশ অতিরিক্ত পরিমাণে ধরা পড়লে ভবিষ্যতে প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে মাছের প্রাপ্যতা রক্ষার জন্য শুধু সমুদ্রে মাছ ধরার পরিমাণ নয়, নদী ও মোহনার পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্য কারণগুলিকেও উপেক্ষা করা যায় না। সমুদ্র উত্তাল থাকলে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলা কঠিন হয় এবং নিরাপত্তার কারণে ট্রলারকে সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ রাখতে হয়। এর ফলে মাছ ধরার সময় ও সুযোগ কমে যায়। ২০২৬ সালের মরশুম নিয়ে প্রকাশিত সংবাদেও অনিশ্চিত বাতাস ও খারাপ সামুদ্রিক আবহাওয়াকে কম ইলিশ পাওয়ার একটি প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। <Cite refs={["turn894461view0"]}/>
এ ছাড়াও অতিরিক্ত মাছ ধরা, অপরিণত ইলিশ আহরণ এবং নদী ও মোহনার পরিবেশের অবনতি মাছের দীর্ঘমেয়াদি প্রাপ্যতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সমস্যাটিকে একক কোনও কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। সামুদ্রিক আবহাওয়া, মাছের প্রকৃত মজুত, পরিযায়ী আচরণ এবং মাছ ধরার পদ্ধতি—সব দিক বিবেচনা করেই পরিস্থিতি বুঝতে হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং মাছ ধরতে না পারা এক বিষয় নয়। সমুদ্রে মাছ থাকলেও খারাপ আবহাওয়া, মাছের অবস্থান পরিবর্তন কিংবা জাল ফেলার অনুকূল পরিস্থিতি না থাকায় মৎস্যজীবীদের জালে মাছ কম উঠতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি মৎস্যসম্পদ সংক্রান্ত তথ্য এবং নির্দিষ্ট মরশুমের মাছ ধরার হিসাব পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ইলিশের জোগান কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে বাজারেও। মাছের চাহিদা বেশি থাকলেও সরবরাহ কম হলে দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে ইলিশ কেনা কঠিন হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, মৎস্যজীবীরা বেশি দাম পেলেই যে লাভবান হবেন, এমন নয়। মাছ ধরার খরচ বেড়ে গেলে এবং জালে মাছ কম উঠলে বাজারদরের বৃদ্ধি তাঁদের লোকসান পুষিয়ে দিতে পারে না।
হুগলি-ভাগীরথী নদীব্যবস্থায় মৎস্যজীবীদের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অনেক মৎস্যজীবী শুধু ইলিশের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন না। তাঁদের একাংশ অন্য মাছ ধরার কাজ কিংবা মৎস্যক্ষেত্রের বাইরের পেশার উপরও নির্ভর করছেন। <Cite refs={["turn205055search0"]}/>
এই পরিস্থিতিতে মৎস্যজীবীদের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ, প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা এবং দুর্যোগের সময় নিরাপদে সমুদ্রে মাছ ধরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিপদের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও লোকসানের ভয়ে কেউ যেন সমুদ্রে যেতে বাধ্য না হন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রথমত, ইলিশের প্রজনন ও পরিযায়ী চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলিকে চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অপরিণত ইলিশ ধরা বন্ধ করার নিয়ম কার্যকরভাবে মানতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তৃতীয়ত, নদীর মোহনা ও প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশ রক্ষায় পলি জমা, দূষণ এবং জলপ্রবাহের পরিবর্তনের প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। ইলিশ সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণাতেও এই ধরনের ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। <Cite refs={["turn205055search9","turn894461view1"]}/>
এর পাশাপাশি সমুদ্রের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, বৃষ্টিপাত, নদীর জলপ্রবাহ এবং মাছের আহরণের পরিমাণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তাতে বোঝা সহজ হবে, কোন সময়ে এবং কোন অঞ্চলে ইলিশের প্রাপ্যতা পরিবর্তিত হচ্ছে। মৎস্যজীবীদের অভিজ্ঞতাকেও এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা দরকার, কারণ তাঁরা সমুদ্রে ও নদীতে মাছের অবস্থান এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন।
মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস, দ্রুত সতর্কবার্তা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সমুদ্রে না যাওয়ার সুযোগ তাঁদের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
ইলিশ শুধু বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির অংশ নয়, এটি উপকূলবর্তী বহু পরিবারের জীবিকার অবলম্বন। তাই সমুদ্রে ইলিশ কম পাওয়ার ঘটনা কেবল বাজারদর বা রসনার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবেশের পরিবর্তন, নদী-সমুদ্রের স্বাভাবিক সম্পর্ক এবং মৎস্যজীবীদের ভবিষ্যৎ।
জলবায়ু পরিবর্তন ইলিশের বিচরণ ও প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অতিরিক্ত মাছ ধরা, নদীর পরিবেশের অবনতি এবং সামুদ্রিক আবহাওয়ার অনিশ্চয়তাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। সমস্যার প্রকৃত কারণ বুঝতে হলে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত মাছ ধরার তথ্য এবং মৎস্যজীবীদের অভিজ্ঞতার সমন্বয় প্রয়োজন।
আজ প্রশ্ন উঠছে—সমুদ্রে গিয়েও যদি ইলিশের দেখা না মেলে, তাহলে আগামী দিনে এই রুপোলি মাছের ভবিষ্যৎ কী? উত্তর খুঁজতে হলে শুধু মাছের জোগানের দিকে তাকালে চলবে না। রক্ষা করতে হবে ইলিশের প্রাকৃতিক আবাস, প্রজননক্ষেত্র এবং তার পরিযায়ী পথ। পাশাপাশি, যাঁদের জীবন এই মাছের উপর নির্ভরশীল, তাঁদেরও দিতে হবে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সহায়তা।
ইলিশের স্বাদ বাঙালির পাতে ফিরিয়ে আনতে হলে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং দায়িত্বশীল মৎস্য আহরণের বিকল্প নেই। কারণ, ইলিশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকলেই সুরক্ষিত থাকবে উপকূলের বহু মানুষের জীবিকা এবং বাংলার দীর্ঘদিনের মৎস্যসংস্কৃতি।