Home ফ্যাক্ট ফাইল পঞ্চায়েতের পাঁচ কাহন পৌর বার্তা জেলার চালচিত্র চাষী ভাই বলছি শরীর স্বাস্থ্য জেলার সেনাপতি মাঠে ময়দানে বিনোদন সম্পাদকীয় কলম
BREAKING NEWS
সমুদ্রে গিয়েও মিলছে না ইলিশ! জলবায়ুর পরিবর্তনে কি বদলে যাচ্ছে মাছের গতিপথ?   •   আজকের আবহাওয়া: বৃষ্টির সম্ভাবনা দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায়, ভাসবে কি বাংলা? নজর আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতিতে   •   দুর্যোগের আগে প্রশাসনিক তৎপরতা, কিন্তু স্থায়ী সুরক্ষা কোথায়? উপকূলবাসীর প্রশ্ন থেকেই যায়   •   গঙ্গার ভাঙন রোধ, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান ও সুন্দরবনের নদীবাঁধ সংস্কারে তৎপরতা, কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী   •   অর্থসংকটের অন্ধকার পেরিয়ে আলোর উৎসব, শ্যাওড়দা গ্রামে ৪৯ বছরের লক্ষ্মীপুজো আজ সম্প্রীতি ও মিলনের প্রতীক   •   আসানসোলে বিনিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ! বিপাকে ১০-১২ হাজার মানুষ, বন্ধ অফিস, উধাও কর্তারা

দুর্যোগের আগে প্রশাসনিক তৎপরতা, কিন্তু স্থায়ী সুরক্ষা কোথায়? উপকূলবাসীর প্রশ্ন থেকেই যায়

28 Oct 2026
04:40 AM


সম্পাদকের কলমে : বড় কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দিলেই প্রশাসনিক তৎপরতা চোখে পড়ে। জেলা প্রশাসন থেকে রাজ্য প্রশাসন, ব্লক দপ্তর থেকে পঞ্চায়েত—সর্বত্র শুরু হয় প্রস্তুতি। উপকূলবর্তী এলাকায় পৌঁছে যান প্রশাসনের আধিকারিকরা, নেওয়া হয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়। দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার থেকে শুরু করে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের প্রস্তুতি—সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রশাসন। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই তৎপরতা কি শুধুই দুর্যোগের প্রাক্কালে, নাকি সাধারণ মানুষের স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও একই গুরুত্ব দেওয়া হয়?

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের আশঙ্কাকে ঘিরে উপকূলবর্তী এলাকায় যে সতর্কতা তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই জরুরি। প্রকৃতির গতিপ্রকৃতি সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বাংলা থেকে দূরে ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান থাকলেও তার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে উদাসীন থাকার সুযোগ নেই। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো উপকূলবর্তী জেলায়, যেখানে বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা প্রকৃতি ও আবহাওয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে আগাম সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সক্রিয় হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক দপ্তর, পঞ্চায়েত, ব্লক এবং জেলা স্তরে সমন্বয় থাকা জরুরি। বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত পদক্ষেপ, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানীয় জলের জোগান এবং জরুরি পরিষেবা সচল রাখা—এসবই প্রশাসনের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনই দুর্যোগের পর তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখানেই উঠে আসে আরও বড় প্রশ্ন। প্রতিবার দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দিলেই কেন এত তৎপরতা? কেন আগাম সতর্কতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার বিষয়টি সব সময় সমান গুরুত্ব পায় না? কেন বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে বহু পরিবারকে নিজেদের ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়?

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী এলাকা অতীতে একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। ঝড়, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস কিংবা নদী ও সমুদ্রের ভাঙন—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষের জীবন ও সম্পত্তি। বহু মানুষের কাছে বাড়ি শুধু বসবাসের জায়গা নয়, সেটিই তাঁদের সারাজীবনের সঞ্চয়, পরিবারের আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। অথচ দুর্যোগের মুখে সেই বাড়িই যখন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—সাধারণ মানুষের স্থায়ী সুরক্ষার জন্য পরিকল্পনা কোথায়?

প্রাকৃতিক দুর্যোগকে পুরোপুরি আটকানো সম্ভব নয়। কিন্তু তার ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের চিহ্নিত করা, দুর্বল বাড়ির পরিবর্তে নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা, মজবুত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, নদীবাঁধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক কাজ হলে দুর্যোগের সময় মানুষের বিপন্নতা অনেকটাই কমতে পারে। এর সঙ্গে প্রয়োজন স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ, কোন এলাকা সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই প্লাবিত হয়, কোথায় বাঁধ দুর্বল, কোন পাড়ার মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন—এই বাস্তব অভিজ্ঞতা স্থানীয় বাসিন্দাদেরই সবচেয়ে ভালো জানা।

ভোটের আগে কিংবা বড় কোনও দুর্যোগের প্রাক্কালে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া নতুন কিছু নয়। মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের সমস্যার কথা শোনা এবং প্রয়োজনীয় সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই অংশ। কিন্তু সেই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন কোথায়, তা জানতে চাওয়ার অধিকারও সাধারণ মানুষের রয়েছে। প্রতিশ্রুতি তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে।

সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চান না। তাঁরা চান নিরাপদে থাকতে, নিশ্চিন্তে সংসার চালাতে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে এবং প্রতিটি দুর্যোগের সময় প্রাণ ও সম্পত্তি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাতে না হয়। তাঁদের কাছে প্রশাসনিক তৎপরতার প্রকৃত অর্থ শুধু বিপদের সময় আধিকারিকদের উপস্থিতি নয়; বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলেও তাঁরা জানেন যে তাঁদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় রয়েছে, প্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছবে এবং দুর্যোগের পর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হবে।

এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও সরকার বা প্রশাসনকে শুধু দুর্যোগের সময়কার তৎপরতা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে, দুর্যোগের মাঝের সময়টুকুতে কী কাজ হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলির জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলির পুনর্নির্মাণ হয়েছে কি না, বাঁধ ও নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন কতটা হয়েছে, বিপর্যয় মোকাবিলার পরিকাঠামো কতটা শক্তিশালী হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা দরকার। একই সঙ্গে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রকল্পের কাজের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশাসনের দায়িত্ব কেবল বিপদের সময় উদ্ধারকাজ চালানো নয়; বিপদের ঝুঁকি কমানোও। কোনও এলাকার মানুষ যদি প্রতি বছর একই সমস্যার মুখোমুখি হন, তাহলে সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে সাময়িক সাহায্য তুলে দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে একই ক্ষতি বারবার না হয়, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো সংবেদনশীল উপকূলবর্তী জেলায় এই ভাবনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। এখানকার বহু মানুষের জীবিকা কৃষিকাজ, মৎস্যচাষ, মাছ ধরা এবং অন্যান্য শ্রমনির্ভর পেশার সঙ্গে যুক্ত। দুর্যোগে বাড়িঘরের ক্ষতি হলে শুধু বসবাসের সমস্যা তৈরি হয় না, ভেঙে পড়ে উপার্জনের পথও। ফলে পুনর্বাসন বলতে কেবল মাথার উপর ছাদ ফিরিয়ে দেওয়া নয়, মানুষের জীবিকা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও বোঝায়।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবকে ঘিরে বর্তমান সতর্কতা তাই প্রশাসনের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও বটে। এখনকার প্রস্তুতি যেন শুধু সাময়িক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ না থাকে। কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোন এলাকায় আরও নিরাপদ আশ্রয় প্রয়োজন, কোন পরিবারগুলি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে—এসব চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। দুর্যোগের আশঙ্কা কেটে যাওয়ার পরেও সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন যেন থেমে না যায়।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের লড়াই নতুন নয়। কিন্তু সেই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষকে একা ফেলে রাখা যায় না। প্রশাসনের সতর্কতা, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, উন্নত পরিকাঠামো এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়েই দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব। আর এই কাজের সাফল্য নির্ধারিত হবে প্রচারের আলোয় নয়, বরং বিপদের সময় কতজন মানুষ নিরাপদে থাকতে পারলেন, কতগুলি পরিবার তাঁদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা রক্ষা করতে পারল, তার ভিত্তিতে।

দুর্যোগের প্রাক্কালে প্রশাসনের তৎপরতা অবশ্যই স্বস্তির বার্তা দেয়। কিন্তু সেই স্বস্তি যেন সাময়িক না হয়। সাধারণ মানুষকে বারবার একই আতঙ্কের মুখোমুখি হতে হলে উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তাই আজ উপকূলবাসীর প্রশ্ন একটাই—বিপদ এলে পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বিপদ থেকে বাঁচার স্থায়ী ব্যবস্থাও কি গড়ে তোলা হবে?

প্রশাসনের কাছে এটাই সময়ের দাবি। প্রতিশ্রুতির বদলে বাস্তব পদক্ষেপ, সাময়িক স্বস্তির বদলে স্থায়ী নিরাপত্তা এবং দুর্যোগকেন্দ্রিক তৎপরতার বদলে সারা বছরের পরিকল্পিত উদ্যোগ—এই পথেই উপকূলবর্তী মানুষের জীবন আরও সুরক্ষিত হতে পারে। কারণ, সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনও আশ্বাস নয়; সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।