নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ওজন কমানোর জন্য অনেকেই সকালের জলখাবার কিংবা বিকেলের খাবারের বিকল্প হিসেবে স্মুদি বেছে নেন। ফল, দুধ, দই, বাদাম এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর উপাদান দিয়ে তৈরি স্মুদি সহজে খাওয়া যায়, সময়ও বাঁচায়। পাশাপাশি সঠিক উপাদান ব্যবহার করলে এটি শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দিতেও সাহায্য করতে পারে। কিন্তু স্মুদি তৈরি করার সময় কয়েকটি সাধারণ ভুলের কারণে এই স্বাস্থ্যকর পানীয়তেই বেড়ে যেতে পারে ক্যালোরি ও চিনির পরিমাণ। ফলে ওজন কমানোর লক্ষ্য পূরণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কতটা খাচ্ছেন এবং খাবারে প্রোটিন, ফাইবার ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য কেমন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্মুদি তৈরির সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার।
স্মুদি তৈরির সময় অনেকেই শুধু কলা, আম, আপেল কিংবা অন্যান্য ফল ব্যবহার করেন। এতে ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবার পাওয়া গেলেও পর্যাপ্ত প্রোটিন নাও থাকতে পারে। ফলে স্মুদি খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার খিদে পেতে পারে।
প্রোটিন শরীরের পেশি গঠনে সাহায্য করে এবং পেট ভরা রাখার অনুভূতি বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখে। ওজন কমানোর সময় পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে পেশির ভর ধরে রাখতে সাহায্য হয়।
স্মুদিতে প্রোটিন বাড়ানোর জন্য চিনি ছাড়া দই, দুধ, সয়া দুধ কিংবা উপযুক্ত পরিমাণে বাদাম বা বীজ যোগ করা যেতে পারে। গ্রিক ইয়োগার্টও প্রোটিনের ভালো উৎস। তবে বাদাম ও বীজে ক্যালোরি বেশি থাকায় পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
ফাইবার বা খাদ্যআঁশ হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু স্মুদি তৈরির সময় ফলের পরিমাণ কম রাখা কিংবা শুধু ফলের রস ব্যবহার করার ফলে ফাইবারের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
আস্ত ফলের পরিবর্তে ফলের রস ব্যবহার করলে অনেক ক্ষেত্রে ফাইবার কম পাওয়া যায়। আবার ফল ছেঁকে নিলেও তার খাদ্যআঁশের একটি বড় অংশ বাদ পড়তে পারে। তাই স্মুদি তৈরির সময় সম্ভব হলে আস্ত ফল ব্যবহার করা ভালো।
ফাইবারের পরিমাণ বাড়াতে ওটস, চিয়া বীজ, ফ্ল্যাক্সসিড বা তিসির বীজ এবং উপযুক্ত পরিমাণে শাকসবজি যোগ করা যেতে পারে। বেরি জাতীয় ফল, আপেল কিংবা নাশপাতিও ভালো বিকল্প হতে পারে।
তবে হঠাৎ করে খাদ্যতালিকায় অনেক বেশি ফাইবার যোগ না করে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত জল পান করা উচিত।
স্মুদি স্বাস্থ্যকর বলেই তাতে ইচ্ছেমতো চিনি যোগ করা যায়, এমন ধারণা ঠিক নয়। অনেকেই স্বাদ বাড়ানোর জন্য চিনি, মধু, সিরাপ, মিষ্টি দই কিংবা ফ্লেভারযুক্ত দুধ ব্যবহার করেন। এর ফলে পানীয়টির ক্যালোরি ও যোগ করা চিনির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
ফলের মধ্যেও প্রাকৃতিকভাবে চিনি থাকে। তবে আস্ত ফলের সঙ্গে পাওয়া ফাইবার ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের কারণে সেটি মিষ্টি পানীয়ের সমতুল্য নয়।
স্মুদিকে স্বাস্থ্যকর রাখতে অতিরিক্ত চিনি বা সিরাপ না দেওয়াই ভালো। কলা, বেরি বা অন্যান্য পাকা ফলের প্রাকৃতিক মিষ্টিই সাধারণত যথেষ্ট। মিষ্টি দইয়ের পরিবর্তে চিনি ছাড়া দই ব্যবহার করলে অপ্রয়োজনীয় চিনি কমানো সহজ হয়।
মনে রাখতে হবে, মধু ও গুড়ও যোগ করা চিনির উৎস। এগুলিকে সাদা চিনির তুলনায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওজন কমানোর উপযোগী বিকল্প ভাবা উচিত নয়।
বাদাম, পিনাট বাটার, চিয়া বীজ, ফ্ল্যাক্সসিড ও অ্যাভোকাডোর মতো উপাদানে উপকারী ফ্যাট এবং বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে। কিন্তু এগুলির অনেকগুলিতেই ক্যালোরির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।
অনেকে স্মুদিতে একসঙ্গে কলা, আম, খেজুর, বাদাম, পিনাট বাটার, মধু ও দুধ যোগ করেন। প্রতিটি উপাদান আলাদাভাবে পুষ্টিকর হলেও সবকিছু বেশি পরিমাণে ব্যবহার করলে একটি স্মুদিতেই অনেক ক্যালোরি জমা হতে পারে।
ওজন কমানোর সময় মোট ক্যালোরি গ্রহণের দিকে নজর রাখা জরুরি। তাই স্মুদি তৈরির সময় উপাদানের পরিমাণ মেপে নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দু-একটি পুষ্টিকর উপাদান বেছে নেওয়া ভালো।
আস্ত ফল চিবিয়ে খাওয়ার পরিবর্তে স্মুদি পান করলে অনেকেই অল্প সময়ে বেশ কিছু খাবার গ্রহণ করে ফেলেন। পানীয়টি দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায় শরীরের তৃপ্তির অনুভূতি বুঝতে সময় লাগতে পারে।
স্মুদি খেলেই ওজন বাড়বে, এমন নয়। তবে অতিরিক্ত দ্রুত খাওয়া কিংবা এক গ্লাস স্মুদির সঙ্গে আরও বেশি খাবার গ্রহণ করলে দৈনিক ক্যালোরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
তাই ধীরে ধীরে স্মুদি পান করুন এবং সেটিকে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করুন। স্মুদিকে নিয়মিত খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত পানীয় হিসেবে যোগ করার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী জলখাবার বা অন্য কোনও খাবারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফল স্মুদির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও শুধু ফল দিয়ে তৈরি পানীয় সব সময় সুষম খাবারের বিকল্প হয় না। বিশেষ করে প্রোটিন ও ফাইবারের ঘাটতি থাকলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।
স্বাদ ও পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে পালং শাকের মতো সবজি, চিনি ছাড়া দই, দুধ বা সয়া দুধ এবং অল্প পরিমাণে ওটস ব্যবহার করা যায়। তবে সব উপাদান একসঙ্গে ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। নিজের পছন্দ, দৈনিক পুষ্টির চাহিদা এবং ক্যালোরির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপাদান নির্বাচন করা উচিত।
- ১টি ছোট কলা
- ১৫০–২০০ মিলিলিটার চিনি ছাড়া দুধ অথবা সয়া দুধ
- ১০০ গ্রাম চিনি ছাড়া দই
- ১–২ টেবিল চামচ ওটস
- প্রয়োজনমতো বরফ ও জল
সব উপাদান ব্লেন্ড করে নিন। অতিরিক্ত চিনি বা মধু যোগ করার প্রয়োজন নেই। দুধ, দই ও ওটসের পরিমাণ অনুযায়ী এতে প্রোটিন ও ফাইবারের পরিমাণ বাড়বে।এই স্মুদিতে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবারের সমন্বয় রয়েছে। তবে এর মোট ক্যালোরি নির্ভর করবে কলার আকার, দুধের ধরন এবং ব্যবহৃত উপাদানের পরিমাণের উপর। ব্যক্তিগত পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী উপাদান পরিবর্তন করা যেতে পারে।
স্মুদি নিজে থেকে ওজন কমানোর কোনও জাদুকরি উপায় নয়। ওজন কমার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে মোট ক্যালোরি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্মুদি যদি অতিরিক্ত ক্যালোরি ও চিনির উৎস হয়ে ওঠে, তাহলে তা ওজন কমানোর প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে। আবার সঠিক উপাদান ও পরিমাণে তৈরি স্মুদি পুষ্টিকর খাবারের অংশ হতে পারে এবং খিদে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে, কিডনির অসুখ আছে কিংবা বিশেষ কোনও খাদ্যসংক্রান্ত বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়, তাঁদের স্মুদির উপাদান ও পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ওজন কমানোর জন্য স্মুদি খাওয়ার সময় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখুন—পর্যাপ্ত প্রোটিন, পর্যাপ্ত ফাইবার এবং অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা। পাশাপাশি বাদাম, মধু ও অন্যান্য ক্যালোরিসমৃদ্ধ উপাদানের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন। স্বাস্থ্যকর উপাদান বেছে নেওয়ার পাশাপাশি সঠিক পরিমাণে খাওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাই দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পথ।