নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: রোজকার রান্নায় ভাজাভুজি অনেকেরই পছন্দের খাবার। লুচি, পুরি, সিঙাড়া, পকোড়া কিংবা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই—ডুবো তেলে ভাজা খাবারের চাহিদা কম নয়। কিন্তু এই খাবারগুলি তৈরি করতে কোন ধরনের তেল ব্যবহার করা হচ্ছে, তেলের তাপমাত্রা কতটা রাখা হচ্ছে এবং একই তেল বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তার উপর খাবারের গুণমান অনেকটাই নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত তাপমাত্রায় তেল গরম করা কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে একই তেল ব্যবহার করার ফলে তেলে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ফলে কিছু ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সব তেলকে একভাবে ক্ষতিকর বলা ঠিক নয়। অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো অয়েল এবং চিনাবাদাম তেলের মতো তেল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ভাজার জন্য উপযুক্ত হতে পারে। অন্যদিকে, কর্ন অয়েল বা সানফ্লাওয়ার অয়েলকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার পরামর্শও সব ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়। তেলের ধরন, পরিশোধন পদ্ধতি, ফ্যাটি অ্যাসিডের গঠন এবং রান্নার তাপমাত্রা—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
যখন কোনও তেলকে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করা হয়, তখন তেলের মধ্যে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড ভেঙে যেতে পারে এবং জারণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে তেল বারবার গরম করা হলে এর রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে অ্যালডিহাইডসহ বিভিন্ন জারণজাত পদার্থ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে তেল ব্যবহার করলে কিছু ক্ষতিকর যৌগের পরিমাণও বাড়তে পারে।
তেলের মধ্যে খাবারের কণা জমে থাকা, বারবার গরম করা এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া ওঠা—এই বিষয়গুলি তেলের গুণমান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই বাড়িতে বা রেস্তরাঁয় ভাজাভুজি তৈরির সময় শুধু তেলের ধরন নয়, তার ব্যবহার পদ্ধতির দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, তেল থেকে ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হওয়ার মাত্রা সব পরিস্থিতিতে সমান নয়। তেলের ধরন, তাপমাত্রা, রান্নার সময় এবং তেল কতবার ব্যবহার করা হয়েছে—এসবের উপর তা নির্ভর করে।
অলিভ অয়েলে মূলত মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। বিশেষ করে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলে বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও পলিফেনল পাওয়া যায়। এই উপাদানগুলি তেলের জারণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
পরিমিত তাপমাত্রায় রান্না ও ভাজার ক্ষেত্রে অলিভ অয়েল ব্যবহার করা যায়। তবে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রা তেলের গুণমান ও অম্লতার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। তাই অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় ধরে ডুবো তেলে ভাজার জন্য তেল নির্বাচন করার সময় সতর্ক থাকা উচিত।
অলিভ অয়েলকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোনও তেলই অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়, কারণ সব রান্নার তেলেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালোরি থাকে।
অ্যাভোকাডো অয়েলেও মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি। বিশেষ করে পরিশোধিত বা রিফাইন্ড অ্যাভোকাডো অয়েল সাধারণত উচ্চ তাপমাত্রায় রান্নার জন্য ব্যবহার করা হয়।
তবে অ্যাভোকাডো অয়েল কেনার সময় সেটি রিফাইন্ড না আনরিফাইন্ড, তা দেখে নেওয়া জরুরি। কারণ প্রক্রিয়াকরণের ধরন অনুযায়ী এর ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রা ও রান্নার উপযোগিতা আলাদা হতে পারে।
এই তেল ব্যবহার করা সম্ভব হলেও সেটিকে সব পরিস্থিতিতে অন্য তেলের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। পাশাপাশি এর দামও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ফলে তেল বেছে নেওয়ার সময় স্বাস্থ্যগত দিকের পাশাপাশি ব্যবহারিক সুবিধা ও খরচও বিবেচনা করা দরকার।
চিনাবাদাম তেল ভারতীয় রান্নায় বহুল ব্যবহৃত একটি তেল। বিশেষ করে রিফাইন্ড চিনাবাদাম তেল তুলনামূলক উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না ও ভাজার জন্য উপযুক্ত হতে পারে। এতে মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পাশাপাশি অন্যান্য অসম্পৃক্ত ফ্যাটও থাকে।
তবে চিনাবাদামে অ্যালার্জি রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই তেল ব্যবহারের আগে সতর্কতা প্রয়োজন। পরিশোধিত চিনাবাদাম তেলে অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী প্রোটিনের পরিমাণ অনেক কম হতে পারে, কিন্তু কোনও ব্যক্তির জন্য সেটি নিরাপদ কি না, তা তাঁর অ্যালার্জির ধরন এবং চিকিৎসকের পরামর্শের উপর নির্ভর করে।
তাই চিনাবাদাম তেল ভাজার একটি বিকল্প হলেও সবার জন্য একে উপযুক্ত বলা যায় না।
কর্ন অয়েল বা ভুট্টার তেল এবং সানফ্লাওয়ার অয়েল বা সূর্যমুখী তেলে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। এই ফ্যাটগুলি পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যতালিকায় স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে অসম্পৃক্ত ফ্যাট ব্যবহার করা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
তবে সব ধরনের সূর্যমুখী তেলের গঠন এক নয়। সাধারণ সূর্যমুখী তেলে লিনোলেইক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি হতে পারে, আবার হাই-ওলেইক সূর্যমুখী তেলে মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে। একইভাবে তেলের পরিশোধন পদ্ধতি এবং গরম করার পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় ধরে তেল গরম করলে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ তেলে জারণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কর্ন অয়েল বা সব ধরনের সানফ্লাওয়ার অয়েল স্বাভাবিক রান্নায় ব্যবহার করলেই তা ক্ষতিকর। বরং কোন তেল কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
১. তেল অতিরিক্ত গরম করবেন না: তেল থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করলে তাপ কমিয়ে দিন। অতিরিক্ত গরম তেলে রান্না করলে তেলের গুণমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
২. একই তেল বারবার ব্যবহার করবেন না: বিশেষ করে তেল গাঢ় হয়ে গেলে, ঘন হয়ে গেলে, দুর্গন্ধ তৈরি হলে বা অতিরিক্ত ফেনা উঠলে তা ফেলে দেওয়া উচিত। শুধু রং দেখে তেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
৩. খাবার ভাজার সময় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন: তাপমাত্রা খুব কম হলে খাবার বেশি তেল শোষণ করতে পারে। আবার অতিরিক্ত তাপমাত্রায় খাবার পুড়ে যেতে পারে এবং তেলের গুণমান নষ্ট হতে পারে।
৪. ভাজাভুজির পরিমাণ কমান: স্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করলেও ডুবো তেলে ভাজা খাবারে ক্যালোরির পরিমাণ বেশি হতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভাজাভুজির পরিবর্তে সেদ্ধ, বেক করা, গ্রিল করা বা অল্প তেলে রান্না করা খাবার রাখুন।
৫. তেল ও খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করুন: তেল আলো, বাতাস ও অতিরিক্ত তাপ থেকে দূরে রাখুন। তেলে খাবারের কণা জমে থাকলে তা দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডুবো তেলে ভাজার জন্য একটিমাত্র তেলকে সবার জন্য সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর বলা যায় না। রিফাইন্ড চিনাবাদাম তেল, উপযুক্ত ধরনের অলিভ অয়েল এবং রিফাইন্ড অ্যাভোকাডো অয়েল রান্নার পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কর্ন অয়েল ও সানফ্লাওয়ার অয়েলকেও শুধু তাদের নামের কারণে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তেলের ফ্যাটি অ্যাসিডের গঠন, তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা এবং ব্যবহারের পদ্ধতি বিবেচনা করা। তেলের পাশাপাশি সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসও স্বাস্থ্যের উপর বড় প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের মূল কথা: স্বাস্থ্যকর তেল বেছে নেওয়ার পাশাপাশি ভাজাভুজি কম খাওয়া, তেল বারবার গরম না করা এবং রান্নার সময় সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখাই দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার অন্যতম উপায়।