নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে রাতে ভালো ঘুম শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে সতেজ রাখতে, মনোযোগ বাড়াতে এবং স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু অনেকেই জানেন না, রাতের খাবারের পর কী পান করছেন, কখন পান করছেন এবং কতটা পান করছেন—এই বিষয়গুলিও ঘুমের গুণমানকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর চা-কফি পান করা, অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় খাওয়া কিংবা শোওয়ার ঠিক আগে প্রচুর জল পান করার অভ্যাস ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
পুষ্টিবিদদের সাধারণ পরামর্শ হল, রাতের খাবারের পর এমন পানীয় বেছে নেওয়া উচিত যাতে ক্যাফেইন কম বা নেই, অতিরিক্ত চিনি নেই এবং যা শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দে বাধা সৃষ্টি করে না। তবে মনে রাখতে হবে, কোনও একটি পানীয় খেলেই যে অনিদ্রা দূর হবে বা ঘুমের সমস্যা সম্পূর্ণ ঠিক হয়ে যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ভালো ঘুমের জন্য খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত ঘুমের সময়, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শোওয়ার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
রাতের খাবারের পর গরম পানীয় খাওয়ার অভ্যাস থাকলে ক্যাফেইনমুক্ত ভেষজ চা বেছে নিতে পারেন। বিশেষ করে ক্যামোমাইল চা অনেকের কাছে জনপ্রিয়। এর হালকা সুগন্ধ ও উষ্ণতা ঘুমের আগে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
ক্যামোমাইলে এমন কিছু উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে, যা নিয়ে ঘুম ও শিথিলতার ক্ষেত্রে গবেষণা হয়েছে। তবে অনিদ্রা দূর করতে ক্যামোমাইল চায়ের কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রমাণ এখনও সীমিত। তাই এটিকে ঘুমের ওষুধের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
কীভাবে পান করবেন?
শোওয়ার আগে অল্প পরিমাণে ক্যাফেইনমুক্ত চা পান করতে পারেন।
অতিরিক্ত চিনি বা মধু মেশানোর প্রয়োজন নেই।
চা পান করার পর অস্বস্তি হলে বা রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙলে পরিমাণ কমিয়ে দিন।
যাঁদের নির্দিষ্ট ফুল বা উদ্ভিদের প্রতি অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের ভেষজ চা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত। ক্যামোমাইলের সঙ্গে কিছু ওষুধের পারস্পরিক ক্রিয়াও হতে পারে।
অনেক বাড়িতেই রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস গরম দুধ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। দুধে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন বি১২-সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। দুধে ট্রিপটোফ্যান নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিডও থাকে, যা শরীরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে শুধু দুধে ট্রিপটোফ্যান রয়েছে বলেই এক গ্লাস দুধ পান করলে দ্রুত ঘুম চলে আসবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। ঘুমের ওপর দুধের সরাসরি প্রভাব নিয়ে গবেষণার ফল এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কারও ক্ষেত্রে রাতে গরম দুধ পান করা একটি আরামদায়ক অভ্যাস হিসেবে কাজ করতে পারে।
কীভাবে পান করবেন?
অল্প পরিমাণে হালকা গরম দুধ পান করতে পারেন।
অতিরিক্ত চিনি, চকোলেট সিরাপ বা মিষ্টি মিশিয়ে পান করা এড়িয়ে চলুন।
দুধ খেলে পেট ফাঁপা, গ্যাস বা অস্বস্তি হলে ল্যাকটোজমুক্ত দুধ অথবা অন্য উপযুক্ত বিকল্প বিবেচনা করুন।
যাঁদের দুধে অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের সাধারণ বা ল্যাকটোজমুক্ত গরুর দুধ—কোনওটিই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।
ঘুমের আগে শরীরে জলের ঘাটতি থাকা যেমন ভালো নয়, তেমনই শোওয়ার ঠিক আগে একসঙ্গে প্রচুর জল পান করাও সমস্যার কারণ হতে পারে। রাতে অতিরিক্ত জল পান করলে অনেকের বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে যায়। এর ফলে ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে।
সাধারণ জলই শরীরের জলের চাহিদা পূরণের সবচেয়ে সহজ উপায়। দিনের বেলায় পর্যাপ্ত জল পান করা এবং রাতে তৃষ্ণা অনুযায়ী জল গ্রহণ করা ভালো অভ্যাস।
কীভাবে পান করবেন?
দিনের বেশির ভাগ সময় জলের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করুন।
রাতের খাবারের সঙ্গে এবং পরে প্রয়োজন অনুযায়ী জল পান করুন।
শোওয়ার ঠিক আগে একসঙ্গে অনেকটা জল পান করার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
তবে চিকিৎসকের নির্দেশে যাঁদের নির্দিষ্ট পরিমাণ জল পান করতে হয়, তাঁদের সেই নির্দেশই মেনে চলা উচিত। বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্র বা কিডনির কিছু রোগে তরল গ্রহণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতে পারে।
রাতের খাবারের পর অনেকের পেট ভার, বমি বমি ভাব কিংবা হালকা হজমের অস্বস্তি হতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্যাফেইনমুক্ত আদার পানীয় একটি বিকল্প হতে পারে। আদা নিয়ে হজম ও বমি বমি ভাবের ক্ষেত্রে গবেষণা রয়েছে, যদিও ঘুম বাড়ানোর জন্য আদা চায়ের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
আদা চা পান করলে কারও কারও আরাম লাগতে পারে। তবে যাঁদের বুকজ্বালা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে আদা বা গরম পানীয় ব্যক্তিভেদে অস্বস্তি বাড়াতেও পারে।
কীভাবে পান করবেন?
অল্প পরিমাণ আদা গরম জলে ভিজিয়ে পানীয় তৈরি করতে পারেন।
চিনি ছাড়া বা খুব সামান্য মিষ্টি দিয়ে পান করুন।
ঘুমের আগে অস্বস্তি বাড়লে এই পানীয় এড়িয়ে চলুন।
বাজারে পাওয়া সব আদা চা ক্যাফেইনমুক্ত নয়। কালো চা বা গ্রিন টির সঙ্গে আদা মেশানো থাকলে তাতে ক্যাফেইন থাকতে পারে। তাই প্যাকেটজাত পানীয় কেনার সময় উপাদান দেখে নেওয়া জরুরি।
লেমন বাম একটি সুগন্ধি ভেষজ উদ্ভিদ। ঐতিহ্যগতভাবে এটি শিথিলতা ও মানসিক প্রশান্তির জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিছু প্রাথমিক গবেষণায় লেমন বামের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে ঘুমের সমস্যা দূর করার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও উচ্চমানের গবেষণা প্রয়োজন।
রাতের খাবারের পর গরম ভেষজ পানীয় পান করার অভ্যাস যদি আপনাকে শান্ত হতে সাহায্য করে, তাহলে ক্যাফেইনমুক্ত লেমন বাম চা বিবেচনা করতে পারেন। তবে একে অনিদ্রার প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
কীভাবে পান করবেন?
প্রথমবার অল্প পরিমাণে পান করে শরীরের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করুন।
অতিরিক্ত মিষ্টি যোগ করবেন না।
নিয়মিত ওষুধ খেলে বা ঘুমের ওষুধ গ্রহণ করলে ভেষজ পানীয় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার ক্ষেত্রে ভেষজ পণ্য গ্রহণের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
ঘুমের গুণমান বজায় রাখতে শুধু কী পান করবেন, তা নয়—কোন পানীয় এড়িয়ে চলবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কফি ও ক্যাফেইনযুক্ত চা: ক্যাফেইন মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ঘুমের সংকেতকে প্রভাবিত করতে পারে। এর প্রভাব অনেক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। তাই যাঁদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের বিকেল ও সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন গ্রহণ কমানো উপকারী হতে পারে। ক্যাফেইনের প্রভাব ব্যক্তি অনুযায়ী আলাদা হয়।
এনার্জি ড্রিংক: অনেক এনার্জি ড্রিংকে উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন ও চিনি থাকে। রাতে এগুলি পান করলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে এবং ঘুমের মান খারাপ হতে পারে।
অ্যালকোহল: অনেকের ধারণা, অ্যালকোহল পান করলে সহজে ঘুম আসে। কিন্তু এটি রাতের পরের অংশে ঘুম ভাঙা, ঘুমের স্বাভাবিক পর্যায়ে ব্যাঘাত এবং নাক ডাকা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই ঘুমের সহায়ক হিসেবে অ্যালকোহল ব্যবহার করা উচিত নয়।
অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয়: বেশি চিনি মেশানো শরবত, কোমল পানীয় বা মিষ্টি দুধের নিয়মিত গ্রহণ অতিরিক্ত ক্যালরি বাড়াতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রাতে এগুলি পান করলে অস্বস্তিও হতে পারে।
পুষ্টিবিদদের সাধারণ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পরামর্শ অনুযায়ী, কয়েকটি অভ্যাস রাতের বিশ্রামকে আরও ভালো করতে সাহায্য করতে পারে।
১. শোওয়ার সময়ের সঙ্গে পানীয়ের সময় মিলিয়ে নিন। শোওয়ার ঠিক আগে বড় গ্লাস পানীয় খাওয়ার বদলে কিছুটা আগে পান করুন। এতে রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙার সম্ভাবনা কমতে পারে।
২. রাতের খাবার খুব দেরিতে খাবেন না। বিশেষ করে ভারী খাবার খেয়েই শুয়ে পড়লে কারও কারও বুকজ্বালা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্স হতে পারে। ব্যক্তিগত সহনশীলতা অনুযায়ী রাতের খাবার ও শোওয়ার মধ্যে পর্যাপ্ত ব্যবধান রাখুন।
৩. ক্যাফেইনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন। শুধু কফি নয়, চা, চকোলেট এবং কিছু এনার্জি ড্রিংকেও ক্যাফেইন থাকে। সারাদিনের মোট ক্যাফেইন গ্রহণের দিকে নজর দিন।
৪. ঘুমের নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখুন। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ঘড়িকে নিয়মিত রাখতে সাহায্য করে।
৫. শোওয়ার আগে শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন। উজ্জ্বল আলো কমানো, মোবাইল ফোনের ব্যবহার সীমিত করা এবং আরামদায়ক পরিবেশ বজায় রাখা ঘুমের প্রস্তুতিতে সহায়ক হতে পারে।
মাঝেমধ্যে ঘুমের সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ঘুম আসতে অসুবিধা হলে, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে অথবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব ও ক্লান্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, সকালে মাথাব্যথা বা পর্যাপ্ত সময় ঘুমিয়েও সতেজ না লাগা—এই লক্ষণগুলিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। এগুলি স্লিপ অ্যাপনিয়াসহ কিছু ঘুমের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার ক্ষেত্রে শুধু পানীয় পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা এবং অনিদ্রার জন্য কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি বা CBT-I কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে।
রাতের খাবারের পর সঠিক পানীয় বেছে নেওয়া ঘুমের জন্য সহায়ক অভ্যাস তৈরি করতে পারে। ক্যাফেইনমুক্ত ভেষজ চা, অল্প পরিমাণ গরম দুধ কিংবা সাধারণ জল—ব্যক্তিগত পছন্দ ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে এগুলি বেছে নেওয়া যায়। তবে কোনও পানীয়ই ভালো ঘুমের নিশ্চয়তা দেয় না।
ঘুমের গুণমান বাড়াতে ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, রাতে অতিরিক্ত তরল গ্রহণ না করা, নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে ঘরোয়া পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।