নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: সারাদিন কাজের মধ্যে শরীরকে সতেজ রাখা, মনোযোগ ধরে রাখা এবং ক্লান্তি কমাতে সকালের নাস্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই প্রাতরাশে রুটি, পাউরুটি, ডিম কিংবা ফল খেতে পছন্দ করেন। তবে যাঁরা মাংস খেতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্যও রয়েছে বেশ কিছু স্বাস্থ্যকর বিকল্প। সঠিক ধরনের মাংস পরিমিত পরিমাণে খেলে শরীরে প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন বি১২, আয়রন ও জিঙ্কের জোগান মিলতে পারে। এই পুষ্টি উপাদানগুলি পেশির স্বাভাবিক কার্যকারিতা, লোহিত রক্তকণিকা তৈরি এবং শরীরের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনও খাবার একাই সারাদিন শক্তি ধরে রাখতে পারে না। দীর্ঘক্ষণ কর্মক্ষম থাকতে প্রোটিনের পাশাপাশি জটিল শর্করা, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইবার এবং পর্যাপ্ত জলও প্রয়োজন। তাই সকালের নাস্তায় স্বাস্থ্যকর মাংসের সঙ্গে গোটা শস্য, সবজি অথবা ফল রাখলে সুষম খাবার তৈরি করা সম্ভব।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, সকালের নাস্তায় খাওয়ার জন্য উপযোগী ছয় ধরনের মাংস এবং সেগুলি কীভাবে স্বাস্থ্যকর উপায়ে খাদ্যতালিকায় রাখা যায়।
স্বাস্থ্যকর মাংসের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে মুরগির মাংস। বিশেষ করে চামড়া ছাড়া মুরগির বুকের মাংসে উচ্চমাত্রায় প্রোটিন এবং তুলনামূলকভাবে কম ফ্যাট থাকে। যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, পেশির গঠন বজায় রাখতে চান কিংবা সকালের খাবারে বেশি প্রোটিন রাখতে চান, তাঁদের জন্য এটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
মুরগির মাংসের প্রোটিন পেশির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করে। পাশাপাশি এতে থাকা ভিটামিন বি৬ শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
কীভাবে খাবেন?
অল্প তেলে রান্না করা মুরগির মাংসের সঙ্গে আটার রুটি খেতে পারেন।
সেদ্ধ বা গ্রিল করা মুরগির মাংস দিয়ে গোটা শস্যের স্যান্ডউইচ তৈরি করা যায়।
মুরগির মাংসের সঙ্গে টমেটো, শসা, পালং শাক বা অন্যান্য সবজি যোগ করুন।
তবে অতিরিক্ত তেল, মাখন, ক্রিম এবং নুন ব্যবহার না করাই ভালো। সকালের নাস্তায় আগের দিনের রান্না করা মাংস খেলে তা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং ভালোভাবে গরম করা হয়েছে কি না, সেদিকেও নজর দিন।
টার্কির মাংস প্রোটিনসমৃদ্ধ এবং চামড়া ছাড়া অংশে তুলনামূলকভাবে কম ফ্যাট থাকে। অনেক দেশে সকালের নাস্তায় টার্কির মাংস ব্যবহার করা হয়। যাঁরা লাল মাংসের পরিবর্তে অন্য কোনও প্রোটিনের উৎস খুঁজছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি বিকল্প হতে পারে।
টার্কিতে প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২ এবং জিঙ্ক পাওয়া যায়। এগুলি শরীরের স্বাভাবিক বিপাক, স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে খাবেন?
রান্না করা টার্কির মাংস দিয়ে গোটা শস্যের স্যান্ডউইচ তৈরি করতে পারেন।
অল্প মশলা দিয়ে গ্রিল করা টার্কির সঙ্গে সবজি খেতে পারেন।
সঙ্গে ওটস, আটার রুটি অথবা অন্য কোনও গোটা শস্য রাখুন।
তবে প্যাকেটজাত টার্কি স্লাইস বা প্রসেসড টার্কি মিট কিনলে তার সোডিয়ামের পরিমাণ পরীক্ষা করুন। বেশি নুনযুক্ত প্রসেসড মাংস নিয়মিত খাওয়া রক্তচাপের জন্য অনুকূল নয়।
গরুর মাংস প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক এবং ভিটামিন বি১২-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশেষ করে চর্বিহীন অংশ বেছে নিলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ কমানো যায়।
গরুর মাংসে থাকা হিম আয়রন শরীর তুলনামূলকভাবে সহজে শোষণ করতে পারে। আয়রন হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে, যা রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। ভিটামিন বি১২ লোহিত রক্তকণিকা তৈরি এবং স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে খাবেন?
অল্প পরিমাণে রান্না করা চর্বিহীন গরুর মাংসের সঙ্গে আটার রুটি খেতে পারেন।
মাংসের সঙ্গে পালং শাক, টমেটো বা অন্য সবজি যোগ করুন।
অতিরিক্ত তেল, ঘি ও মাখন দিয়ে রান্না করা এড়িয়ে চলুন।
তবে গরুর মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। লাল মাংস অতিরিক্ত খাওয়ার পরিবর্তে মুরগি, মাছ, ডাল এবং অন্যান্য প্রোটিনের উৎসের সঙ্গে পালা করে খাওয়া ভালো। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
যাঁরা শুয়োরের মাংস খান, তাঁদের জন্য চর্বিহীন অংশ সকালের খাবারে প্রোটিনের উৎস হতে পারে। বিশেষ করে টেন্ডারলয়েনের মতো চর্বিহীন অংশে প্রোটিনের পাশাপাশি থায়ামিন বা ভিটামিন বি১ পাওয়া যায়।
ভিটামিন বি১ শরীরের শর্করা থেকে শক্তি উৎপাদন এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাংসে থাকা প্রোটিন পেশির রক্ষণাবেক্ষণেও সাহায্য করে।
কীভাবে খাবেন?
ভালোভাবে রান্না করা চর্বিহীন মাংস অল্প পরিমাণে আটার রুটি বা গোটা শস্যের পাউরুটির সঙ্গে খেতে পারেন।
সঙ্গে সবজি রাখুন, যাতে খাবারে ফাইবার ও অন্যান্য পুষ্টি যোগ হয়।
বেকন, সসেজ, হ্যাম এবং অতিরিক্ত নুন দিয়ে সংরক্ষিত মাংসকে প্রতিদিনের প্রাতরাশের প্রধান খাবার না করাই ভালো।
বিশেষ করে বেকন ও সসেজের মতো প্রসেসড মাংসের নিয়মিত গ্রহণ কমানো গুরুত্বপূর্ণ। এগুলিতে নুন ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকতে পারে। প্রসেসড মাংসের ঘনঘন গ্রহণ কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সকালের নাস্তায় স্বাস্থ্যকর মাংসের বিকল্প হিসেবে মাছকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। মাছ প্রাণিজ প্রোটিনের ভালো উৎস। বিশেষ করে স্যামন, সার্ডিন ও ম্যাকেরেলের মতো তৈলাক্ত মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়, যা হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য উপকারী।
ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসে রুই, কাতলা, ইলিশ, ছোট সামুদ্রিক মাছসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ খাওয়া হয়। তবে সব মাছের ওমেগা-৩-এর পরিমাণ এক নয়। তৈলাক্ত মাছ সাধারণত এই ফ্যাটি অ্যাসিডের ভালো উৎস।
কীভাবে খাবেন?
অল্প তেলে রান্না করা মাছের সঙ্গে রুটি ও সবজি খেতে পারেন।
সেদ্ধ বা গ্রিল করা মাছ দিয়ে গোটা শস্যের স্যান্ডউইচ তৈরি করা যায়।
অতিরিক্ত নুনযুক্ত শুকনো মাছ বা নিয়মিত ডিপ ফ্রাই করা মাছের পরিবর্তে কম তেলে রান্না করা মাছ বেছে নিন।
মাছের প্রোটিন শরীরের পেশি রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করে। আর ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সুষম খাদ্যাভ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
খরগোশের মাংস বিশ্বের কিছু অঞ্চলে পরিচিত একটি প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস। এর চর্বিহীন অংশে প্রোটিন এবং বিভিন্ন বি-ভিটামিন পাওয়া যায়। তবে ভারতীয় পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এটি খুব একটা প্রচলিত নয়।
খরগোশের মাংসের পুষ্টিগুণ নির্ভর করে মাংসের নির্দিষ্ট অংশ, রান্নার পদ্ধতি এবং পরিবেশনের পরিমাণের ওপর। অন্য চর্বিহীন মাংসের মতো এটিও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
কীভাবে খাবেন?
মাংস ভালোভাবে রান্না করে অল্প তেলে পরিবেশন করুন।
সঙ্গে গোটা শস্য এবং বিভিন্ন রঙের সবজি রাখুন।
অতিরিক্ত নুন, ভারী সস এবং বেশি পরিমাণে মাখন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
এই ধরনের মাংস বেছে নেওয়ার আগে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা এবং স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা বিধি মেনে চলা জরুরি।
শুধু প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেলেই সারাদিন শক্তি বজায় থাকবে, এমন নয়। দীর্ঘস্থায়ী শক্তির জন্য প্রাতরাশে প্রোটিন, জটিল শর্করা, ফাইবার এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সমন্বয় থাকা দরকার।
একটি সুষম প্রাতরাশে রাখতে পারেন:
প্রোটিন: মুরগির মাংস, মাছ অথবা চর্বিহীন মাংস।
জটিল শর্করা: ওটস, লাল আটার রুটি বা গোটা শস্যের পাউরুটি।
ফাইবার: শাকসবজি অথবা একটি গোটা ফল।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: পরিমিত বাদাম, বীজ অথবা উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেল।
জল: রাতের ঘুমের পর শরীরের জলের চাহিদা পূরণ করতে পর্যাপ্ত জল পান করুন।
প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ সুষম খাবার পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে, শুধু মিষ্টি খাবার বা পরিশোধিত শর্করার ওপর নির্ভর করলে অনেকের ক্ষেত্রে দ্রুত আবার খিদে পেতে পারে।
সব মানুষের জন্য একই পরিমাণ মাংস উপযুক্ত নয়। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, মোট ক্যালরির চাহিদা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত বিষয়ের ওপর খাবারের পরিমাণ নির্ভর করে। তাই নির্দিষ্ট কোনও পরিমাণকে সবার জন্য আদর্শ বলা যায় না।
সাধারণভাবে, চর্বিহীন মাংস, মাছ এবং অন্যান্য প্রোটিনের উৎস পালা করে খাওয়া ভালো। লাল মাংস সীমিত রাখা এবং প্রসেসড মাংস যতটা সম্ভব কম খাওয়া স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যাঁদের কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা অন্য কোনও বিশেষ স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।