নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: পুজোর আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখা আর পরিবারের সঙ্গে উৎসব কাটানোর স্বপ্ন—সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনায়। কলকাতার চোরবাগানে ঠাকুর দেখতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না বিষ্ণুপুরের এগারো গ্রামের তরুণী স্নেহা ভাণ্ডারীর। উৎসবের মরশুমে প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে তাঁর পরিবার। বাড়িতে এখন কান্নার রোল, আত্মীয়-প্রতিবেশীদের ভিড়। আর মেয়ের ফিরে আসার অপেক্ষায় বুকভাঙা যন্ত্রণায় দিন কাটছে মায়ের।
পুজোর দিনগুলিতে কলকাতার রাস্তায় মানুষের ঢল নামে। আলোয় সেজে ওঠে শহর, মণ্ডপে মণ্ডপে চলে প্রতিমা দর্শন। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে ঠাকুর দেখা, আড্ডা আর আনন্দে মেতে ওঠেন তরুণ-তরুণীরা। স্নেহা ভাণ্ডারীর কাছেও পুজো ছিল এমনই আনন্দের সময়। কিন্তু সেই আনন্দের মুহূর্তই যে তাঁর পরিবারের জীবনে চিরস্থায়ী শূন্যতা তৈরি করবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।
পরিবারের সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার বোন নেহা এবং আরও দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন স্নেহা। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল, রবিবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পুজোর আনন্দ ভাগ করে নেবেন তিনি। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে পরিকল্পনা বদলে শনিবারই ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সেই সময় স্নেহার মা ছিলেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে। মায়ের ইচ্ছা ছিল, পুজোর সময় তিনিও একটু ঘুরে বেড়ান, আনন্দ করুন। মেয়েও মাকে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে বলেছিলেন। কে জানত, সেই সামান্য আনন্দের পরিকল্পনার আড়ালেই অপেক্ষা করছে এমন এক মর্মান্তিক পরিণতি!
বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মাকে ফোন করেছিলেন স্নেহা। বাবার খাওয়াদাওয়া হয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি মাকে বলেছিলেন, তিনি ঠাকুর দেখতে যাচ্ছেন। ফোনের ওপার থেকে মায়ের স্বাভাবিক উত্তর ছিল, “সাবধানে যাস।”
প্রতিদিনের মতোই ছিল সেই কথোপকথন। ছিল না কোনও বিশেষ বিদায়, ছিল না কোনও অশুভ আশঙ্কা। কিন্তু মা কি জানতেন, মেয়ের সঙ্গে সেই কথাই একদিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে থাকবে?
এরপরই বদলে গেল সবকিছু। ছোট মেয়ে নেহার ফোনে বড় মেয়ে স্নেহার মৃত্যুসংবাদ জানতে পারেন মা। যে মেয়েকে কিছুক্ষণ আগেই সাবধানে যেতে বলেছিলেন, সেই মেয়েই আর বাড়ি ফিরবে না—এই সত্য মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে যেন অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
পুজোর আনন্দের বদলে মুহূর্তের মধ্যে পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। যে বাড়িতে উৎসবের পরিকল্পনা চলছিল, সেখানে শুরু হয় কান্না আর হাহাকার। মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি বারবার ফিরে আসছে মায়ের মনে। সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর, সেই সাধারণ কথাবার্তা—সবই এখন শুধুই স্মৃতি।
স্নেহা ভাণ্ডারী পেশায় ছিলেন কম্পিউটার প্রশিক্ষক। কর্মক্ষেত্রে তাঁকে সবাই ‘ম্যাডাম’ বলে ডাকতেন। নিজের কাজের জগতে এই পরিচয় তৈরি করেছিলেন তিনি। মেয়ের পেশা ও পরিচয় নিয়ে গর্ব ছিল মায়েরও।
কিন্তু আজ সেই ডাক আর কোনও দিন শুনতে পাবেন না মা। কর্মস্থলে আর ফিরবেন না স্নেহা, আর কেউ তাঁকে ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করবেন না। মেয়েকে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে মায়ের মুখে বারবার ফিরে আসছে সেই কথাই—“ম্যাডাম আর ফিরবে না…”
এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই যেন ধরা পড়েছে এক মায়ের সমস্ত অসহায়তা। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল ভবিষ্যতের কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্ন, সেই সন্তানকে হারিয়ে আজ দিশাহারা পরিবার। স্নেহার অনুপস্থিতি শুধু তাঁর বাড়িতেই নয়, তাঁর কর্মজীবন ও পরিচিত মহলেও তৈরি করেছে গভীর শূন্যতা।
স্নেহার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিষ্ণুপুরের এগারো গ্রামের বাড়িতে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং পরিচিতদের ভিড় জমেছে বাড়িতে। সকলের চোখেমুখে অবিশ্বাস, শোক আর হারানোর বেদনা।
যে তরুণী বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, তাঁর এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই। পরিবারের সদস্যদের কাছে এখন প্রতিটি মুহূর্তই যেন অসহনীয়। উৎসবের দিনে বাড়ি ফেরার কথা ছিল স্নেহার, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা ছিল। অথচ সেই অপেক্ষা শেষ হয়েছে এক মর্মান্তিক সংবাদে।
অন্যদিকে, কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে তখনও পুজোর আলো, মণ্ডপে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় এবং উৎসবের আবহ। শহরজুড়ে আনন্দের ছবি থাকলেও স্নেহার পরিবারের কাছে এই পুজো চিরদিনের জন্য বেদনার স্মৃতি হয়ে রইল।
স্নেহা ভাণ্ডারীর মৃত্যুর ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, উৎসবের আনন্দের মাঝেও নিরাপত্তা ও সতর্কতার গুরুত্ব কতটা। জনবহুল এলাকায় বড় জমায়েতের সময় প্রশাসন, আয়োজক এবং সাধারণ মানুষ—সকলেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। তবে এই ঘটনায় ঠিক কী পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়।
একটি পরিবার হারাল তাদের প্রিয় সন্তানকে, এক মা হারালেন তাঁর আদরের মেয়েকে। আর বিষ্ণুপুরের এগারো গ্রামের মানুষের মনে থেকে গেল এক তরুণীর অসময়ে চলে যাওয়ার বেদনাদায়ক স্মৃতি।
ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলেন স্নেহা। হয়তো মনে ছিল অনেক আনন্দ, অনেক গল্প আর বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর স্বপ্ন। কিন্তু সেই বাড়িতে আর ফেরা হলো না তাঁর। পুজোর আলোয় যখন চারদিক ঝলমল করছে, তখন স্নেহার বাড়িতে শুধু অন্ধকার, কান্না আর একটাই অসহনীয় সত্য—মায়ের কাছে আর কোনও দিন ফিরবেন না তাঁর আদরের স্নেহা।