নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক :আধুনিকতার চাকচিক্য থেকে বেরিয়ে প্রকৃতি ও আদিম জীবনসংস্কৃতির এক অন্য জগৎকে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরেছে সোদপুরের নাটাগড় রামকৃষ্ণ নগর ত্রিশক্তি সংঘের দুর্গাপুজো। এবছর এই পুজোর বিশেষ আকর্ষণ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের জাড়োয়া সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে তৈরি থিম। বাঁশ, কাঠ-সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে পুজোমণ্ডপ। মহাদ্বিতীয়ার শুভক্ষণে এই মণ্ডপের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বাসিন্দারা এবং ক্লাবের কার্যকর্তারা।
দুর্গাপুজো মানেই বাংলার মানুষের কাছে আনন্দ, আবেগ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। প্রতি বছর বিভিন্ন পুজো কমিটি নতুন নতুন থিমের মাধ্যমে সমাজ, ইতিহাস, প্রকৃতি এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জীবনযাত্রাকে তুলে ধরার চেষ্টা করে। সেই ধারাকে সামনে রেখেই এবছর নাটাগড় রামকৃষ্ণ নগর ত্রিশক্তি সংঘ বেছে নিয়েছে আন্দামানের জাড়োয়া সম্প্রদায়ের জীবনসংস্কৃতিকে।
এই পুজোর মণ্ডপসজ্জায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহারে। বাঁশ, কাঠ এবং অন্যান্য উপাদানের সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জাড়োয়া সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, জীবনধারা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্কের চিত্র। মণ্ডপের বিভিন্ন অংশে সেই জীবনযাত্রার পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা পরিচিত শহুরে পরিবেশের বাইরে এক ভিন্ন জীবনসংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
থিমের মূল আকর্ষণ শুধু মণ্ডপের বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপন সম্পর্কে মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা। বর্তমান সময়ে দ্রুত নগরায়ণ ও আধুনিক জীবনযাত্রার মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছে, তখন এই ধরনের থিম দর্শনার্থীদের নতুনভাবে ভাবার সুযোগ করে দেয়।
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জাড়োয়া সম্প্রদায় ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে একটি। তাঁদের নিজস্ব জীবনধারা, ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এই সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে তাঁদের সংস্কৃতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁদের মর্যাদা, ব্যক্তিগত পরিসর এবং নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাটাগড় রামকৃষ্ণ নগর ত্রিশক্তি সংঘের এবছরের থিমের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সামনে সেই ভিন্ন জীবনসংস্কৃতির একটি শিল্পসম্মত উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়েছে। মণ্ডপের সাজসজ্জার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাপনের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মহাদ্বিতীয়ার দিন পুজোমণ্ডপের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এলাকার অধিবাসীবৃন্দ ও ক্লাবের কার্যকর্তারা। পুজোর প্রস্তুতি এবং থিমের পরিকল্পনাকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আগ্রহ দেখা যায়।
পুজো কমিটির এই উদ্যোগে স্থানীয় এলাকার সাংস্কৃতিক পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে দর্শনার্থীরা মণ্ডপ পরিদর্শনের পাশাপাশি আন্দামানের জাড়োয়া সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন।
বর্তমান সময়ে দুর্গাপুজোর থিম শুধু বিনোদন বা শিল্পকলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়কে সামনে এনে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রেও থিমভিত্তিক পুজো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নাটাগড় রামকৃষ্ণ নগর ত্রিশক্তি সংঘের এবছরের ভাবনাতেও উঠে এসেছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং প্রাকৃতিক উপকরণের গুরুত্ব।
বাঁশ ও কাঠের মতো উপকরণ দিয়ে তৈরি মণ্ডপের মাধ্যমে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার ভাবনাকে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় জীবনসংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহও তৈরি করছে এই উদ্যোগ।
সব মিলিয়ে, উত্তর ২৪ পরগনার সোদপুরের নাটাগড় রামকৃষ্ণ নগর ত্রিশক্তি সংঘের দুর্গাপুজো এবছর থিমের অভিনবত্বের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। আন্দামানের জাড়োয়া সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে তৈরি এই মণ্ডপে যেমন রয়েছে শিল্প ও সৃজনশীলতার ছোঁয়া, তেমনই রয়েছে প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার বার্তা।
প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির পরিচয় এবং ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা—এই ভাবনাগুলিকেই সামনে রেখে মহাদ্বিতীয়ায় পথচলা শুরু করল নাটাগড় রামকৃষ্ণ নগর ত্রিশক্তি সংঘের এবছরের দুর্গাপুজো।