নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: বাথরুম ব্যবহার করে বেরিয়ে আসার কিছুক্ষণ পরেই আবার প্রস্রাবের বেগ অনুভূত হচ্ছে? অনেকের ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। একবার প্রস্রাব করার পরও বারবার প্রস্রাবের অনুভূতি হওয়া সবসময় যে গুরুতর কোনও সমস্যার লক্ষণ, তা নয়। তবে এর পিছনে মূত্রনালীর সংক্রমণ, মূত্রথলির বিভিন্ন সমস্যা, কিছু দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা কিংবা মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মতো একাধিক কারণ থাকতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজনীয়তাকে বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হয়। কারও ক্ষেত্রে সত্যিই বেশি পরিমাণ প্রস্রাব তৈরি হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়া বা মূত্রথলির অতিসক্রিয়তার কারণে অল্প প্রস্রাব থাকলেও বারবার বেগ অনুভূত হতে পারে। তাই শুধু প্রস্রাবের সংখ্যা দেখে কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
প্রস্রাবের পরেও দ্রুত আবার বেগ আসার অন্যতম সাধারণ কারণ হতে পারে মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI)। সংক্রমণ হলে অনেক সময় অল্প পরিমাণ প্রস্রাব হলেও বারবার বাথরুমে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। এর সঙ্গে প্রস্রাবের সময় জ্বালা বা ব্যথা, তলপেটে অস্বস্তি, প্রস্রাবের গন্ধের পরিবর্তন কিংবা কখনও প্রস্রাবে রক্তের মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
তবে শুধুমাত্র উপসর্গের ভিত্তিতে সংক্রমণ নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজনে চিকিৎসক প্রস্রাব পরীক্ষা করে সমস্যার কারণ নির্ণয় করতে পারেন।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মূত্রথলি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সক্রিয় হয়ে পড়ে। একে সাধারণভাবে Overactive Bladder বলা হয়। এই অবস্থায় মূত্রথলিতে খুব বেশি প্রস্রাব জমা না হলেও হঠাৎ তীব্র প্রস্রাবের বেগ অনুভূত হতে পারে। কখনও কখনও বাথরুমে পৌঁছানোর আগেই প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়ার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এই ধরনের উপসর্গ নিয়মিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ এর পিছনে একাধিক শারীরিক কারণ থাকতে পারে।
প্রস্রাব করার পরও যদি মূত্রথলিতে কিছুটা প্রস্রাব থেকে যায়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার বেগ অনুভূত হতে পারে। মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার কারণ নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে প্রস্টেটের আকার বৃদ্ধির মতো সমস্যা প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা তৈরি করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রস্রাব শুরু হতে সময় লাগা, দুর্বল ধারায় প্রস্রাব হওয়া, বারবার বাথরুমে যাওয়া অথবা প্রস্রাব করার পরও পুরোপুরি খালি না হওয়ার অনুভূতি থাকতে পারে।
অল্প সময়ের মধ্যে বেশি পরিমাণ জল, চা, কফি বা অন্যান্য তরল পান করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় অনেকের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের বেগ বাড়াতে পারে। ফলে বারবার বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত জল পান করা জরুরি। শুধু বারবার প্রস্রাব হচ্ছে বলে নিজের ইচ্ছায় জল খাওয়া অত্যন্ত কমিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
বারবার প্রস্রাব হওয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা ওজন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে ডায়াবেটিসের বিষয়টিও চিকিৎসক বিবেচনা করতে পারেন। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করে এবং এর ফলে প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিকভাবে ঘন ঘন প্রস্রাব হলে শুধুমাত্র মূত্রনালীর সমস্যা ধরে না নিয়ে সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শারীরিক কারণের পাশাপাশি মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাও প্রস্রাবের বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে। উদ্বেগের সময় শরীরের স্বাভাবিক ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তনের কারণে অনেকের ঘন ঘন প্রস্রাবের অনুভূতি হতে পারে।
পরীক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ কাজ, ভ্রমণ বা কোনও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আগে বারবার বাথরুমে যাওয়ার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলতে থাকলে শুধুমাত্র মানসিক চাপের কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শারীরিক কারণও পরীক্ষা করা দরকার।
বাথরুম ব্যবহারের পরেও বারবার প্রস্রাবের বেগ অনুভূত হলে এবং তা কয়েকদিন ধরে চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে প্রস্রাবের সময় তীব্র ব্যথা বা জ্বালা, জ্বর, কোমর বা পাশের দিকে ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত, প্রস্রাব আটকে যাওয়া, অস্বাভাবিক তৃষ্ণা কিংবা হঠাৎ প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
উপসর্গের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসক প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্তে শর্করা পরীক্ষা বা প্রয়োজনে অন্যান্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
সবশেষে, বাথরুম ব্যবহারের পরেও প্রস্রাবের বেগ অনুভূত হওয়া একটি সাধারণ উপসর্গ হলেও এর কারণ সবার ক্ষেত্রে এক নয়। সংক্রমণ, মূত্রথলির সমস্যা, মূত্রনালীর বাধা, কিছু দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা, অতিরিক্ত তরল বা ক্যাফেইন গ্রহণ এবং মানসিক চাপ—বিভিন্ন কারণ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। তাই সমস্যা নিয়মিত হলে কারণ না জেনে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।