দীপাবলি মানেই আলোর উৎসব। অন্ধকার দূর করে ঘরে ঘরে আলো জ্বালানোর এই বিশেষ দিনে সাজসজ্জার নানা আধুনিক উপকরণের পাশাপাশি আজও বিশেষ জায়গা ধরে রেখেছে মাটির প্রদীপ। বাজারে এলইডি আলো, রঙিন ঝালর বাতি কিংবা নানা ধরনের বৈদ্যুতিক আলোর সমাহার থাকলেও প্রদীপের ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। আর সেই ঐতিহ্যকেই নতুন রূপে সাজিয়ে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন আসানসোলের সার্বানী নাগ।
গত কয়েক বছর ধরে দীপাবলিকে কেন্দ্র করে রঙিন মাটির প্রদীপ তৈরি ও সাজানোর কাজ করছেন সার্বানী। তাঁর কথায়, সাধারণ মাটির প্রদীপের পাশাপাশি রঙিন প্রদীপ দেখতে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। বিভিন্ন রং ও নকশায় সাজানো এই প্রদীপ ঘরের সাজসজ্জায় আলাদা মাত্রা যোগ করে। সেই কারণেই ক্রেতাদের মধ্যে এর প্রতি বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর ধরে তিনি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর তৈরি প্রদীপের চাহিদাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
একসময় দীপাবলির প্রস্তুতি মানেই ছিল বাজার থেকে মাটির প্রদীপ কেনা, সেগুলি পরিষ্কার করে তেল ও সলতে দিয়ে সাজিয়ে রাখা। বর্তমানে আধুনিক আলোর নানা বিকল্প বাজারে এলেও মাটির প্রদীপের আবেদন কমেনি। বরং রঙিন নকশা, আকর্ষণীয় সাজ এবং বিভিন্ন ধরনের কম্বো প্যাকেজের মাধ্যমে প্রদীপের বাজারে নতুনত্ব এসেছে।
সার্বানী নাগও সেই চাহিদার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন ধরনের প্রদীপ তৈরি ও সাজিয়ে ক্রেতাদের সামনে নিয়ে আসছেন। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে থালাসহ ১৪টি প্রদীপের বিশেষ কম্বো। পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে সিঙ্গেল ড্রপ প্রদীপ এবং তেল-সলতে ছাড়াই জ্বালানো যায় এমন ইনস্ট্যান্ট মোমের দিয়া। ফলে ক্রেতারা নিজেদের পছন্দ, প্রয়োজন ও বাজেট অনুযায়ী পণ্য বেছে নিতে পারছেন।
শুধু দীপাবলির প্রদীপ তৈরি করাই নয়, বিয়েবাড়ির উপহার সাজানোর কাজও করেন সার্বানী। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বিশেষ উপলক্ষকে কেন্দ্র করে উপহার সাজানোর ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। উৎসবের মরশুমে প্রদীপের কাজের পাশাপাশি এই ধরনের অর্ডারও তাঁর কাজের পরিধি বাড়িয়েছে।
তাঁর তৈরি প্রদীপের দাম নির্ভর করে নকশা, আকার এবং প্যাকেজের ধরনের উপর। থালাসহ ১৪টি প্রদীপের কম্বো থেকে শুরু করে আলাদা প্রদীপ—বিভিন্ন ধরনের পণ্যই পাওয়া যায় তাঁর কাছে। ফলে একসঙ্গে অনেকগুলি প্রদীপ কিনতে চান কিংবা ঘরের নির্দিষ্ট কোনও জায়গা সাজানোর জন্য একটি বিশেষ প্রদীপ খুঁজছেন, দু'ধরনের ক্রেতার জন্যই রয়েছে বিকল্প।
দীপাবলির আগে থেকেই রঙিন প্রদীপের অর্ডার আসতে শুরু করেছে। সার্বানী জানিয়েছেন, চলতি বছরের মোট অর্ডারের প্রায় অর্ধেক ইতিমধ্যেই তিনি ডেলিভারি দিয়ে দিয়েছেন। উৎসব যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ক্রেতাদের আগ্রহ। তাঁর অভিজ্ঞতায়, প্রতি বছরই প্রদীপের চাহিদা আগের তুলনায় বাড়ছে।
এই বাড়তি চাহিদা তাঁর কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহেরই প্রতিফলন। বিশেষ করে যাঁরা বাড়ির সাজসজ্জায় ঐতিহ্যবাহী উপকরণের সঙ্গে আধুনিক রঙের ছোঁয়া রাখতে চান, তাঁদের কাছে রঙিন মাটির প্রদীপ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
দীপাবলির আলো শুধু ঘর আলোকিত করে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পারিবারিক স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। মাটির প্রদীপ সেই আবেগেরই একটি পরিচিত প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই প্রদীপ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে। আধুনিক আলোর ব্যবহার বাড়লেও প্রদীপ জ্বালানোর আনন্দ ও তাৎপর্য এখনও মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
সার্বানী নাগের মতো উদ্যোগীরা সেই পুরনো ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরছেন। রঙিন নকশা ও বিভিন্ন ধরনের পণ্যের মাধ্যমে তাঁরা মাটির প্রদীপকে বর্তমান সময়ের ঘর সাজানোর উপযোগী করে তুলছেন। একই সঙ্গে এই ধরনের কাজ স্থানীয় উদ্যোগ ও সৃজনশীলতারও পরিচয় বহন করছে।
সব মিলিয়ে, আসানসোলের সার্বানী নাগের উদ্যোগে দীপাবলির চেনা মাটির প্রদীপ পেয়েছে নতুন সাজ। ঝলমলে বৈদ্যুতিক আলোর ভিড়েও মাটির প্রদীপের ঐতিহ্য যে আজও অটুট, তাঁর কাজ ও ক্রেতাদের বাড়তে থাকা আগ্রহ যেন সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।